প্রায় পাঁচ শতক আগে এক আফ্রিকান ক্রীতদাস এমন এক অভিযাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন, যা উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জাহাজডুবি, অনাহার, বন্দিদশা ও হাজার মাইলের দুরূহ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অন্বেষণের অন্যতম অগ্রদূত। ইতিহাসে তিনি পরিচিত এস্তেভ্যানিকো নামে, যদিও তাঁর প্রকৃত নাম আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

১৫২৮ সালে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস উপকূলে যখন একদল বিধ্বস্ত নাবিক ভেসে এসে পৌঁছায়, তখন তাঁদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। প্রায় এক মাস ধরে মেক্সিকো উপসাগরের উত্তাল সাগরে একটি অস্থায়ী নৌযানে ভেসে থাকার পর তারা গ্যালভেস্টনের কাছাকাছি একটি দ্বীপে আছড়ে পড়ে। গাছের কাঠ, ঘোড়ার চামড়া এবং ছেঁড়া পোশাক দিয়ে তৈরি সেই নৌযানই ছিল তাঁদের শেষ ভরসা।

একসময় স্পেন থেকে প্রায় ৬০০ সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা অভিযাত্রী দলের অধিকাংশই পথে প্রাণ হারান। ঝড়, রোগ, অনাহার এবং স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে একের পর এক মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত মাত্র চারজন বেঁচে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন স্প্যানিশ এবং চতুর্থজন ছিলেন মরক্কোতে জন্ম নেওয়া আফ্রিকান ক্রীতদাস এস্তেভ্যানিকো।

পরবর্তী আট বছরে তিনিই হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং কার্যত পথপ্রদর্শক। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি ছিলেন বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশকারী প্রথম নথিভুক্ত আফ্রিকান, আরবিভাষী এবং মুসলিম ব্যক্তিদের একজন।

ইতিহাস গড়া দীর্ঘ পদযাত্রা

১৫২৮ থেকে ১৫৩৬ সালের মধ্যে এস্তেভ্যানিকো ফ্লোরিডা থেকে মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২৫০ মাইল বা প্রায় ৩ হাজার ৬২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। গবেষকদের মতে, এটি উত্তর আমেরিকার প্রথম বৃহৎ স্থলপথ অভিযাত্রাগুলোর একটি।

এই যাত্রা বিখ্যাত লুইস ও ক্লার্ক অভিযানেরও প্রায় তিন শতাব্দী আগের ঘটনা। ফলে উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সম্পর্কে ইউরোপীয়দের প্রথম দিকের জ্ঞানের পেছনে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

মরক্কো থেকে স্প্যানিশ অভিযানে

ইতিহাসবিদদের ধারণা, ১৫০০ শতকের শুরুতে মরক্কোর আজেমুর শহরে তাঁর জন্ম। পরে স্প্যানিশ অভিযাত্রী আন্দ্রেস ডোরান্টেস ডি ক্যারানজা তাঁকে ক্রীতদাস হিসেবে কিনে নেন।

সেই সময় মুসলিমদের অনেক অভিযানে অংশ নেওয়ার অনুমতি ছিল না। ফলে তাঁকে জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করানো হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় ‘এস্তেভ্যানিকো’। পরবর্তীতে তিনি স্পেনের নারভায়েজ অভিযানে অংশ নেন।

১৫২৭ সালে পাঁচটি জাহাজ ও প্রায় ৬০০ মানুষ নিয়ে শুরু হওয়া সেই অভিযান শুরু থেকেই দুর্ভাগ্যের শিকার হয়। ঝড়, রোগব্যাধি ও খাদ্যসংকটে দলটি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৫২৮ সালে ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

বন্দিদশা থেকে নেতৃত্বে

ফ্লোরিডা থেকে যাত্রার পর অভিযাত্রীরা নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। খাদ্যের অভাবে তারা নিজেদের ঘোড়াও জবাই করে খেতে বাধ্য হয়। পরে অস্থায়ী ভেলা তৈরি করে উপকূল ধরে এগোতে গিয়ে টেক্সাস অঞ্চলে পৌঁছায়।

সেখানে স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে বন্দী হওয়ার পর এস্তেভ্যানিকোর ভাষাজ্ঞান এবং পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের তুলনায় বেশি সুবিধা দেয়। তিনি আরবি, তামাজাইট, স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। বন্দিদশায় তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিও আয়ত্ত করেন।

পাঁচ বছর পর তিনি বাকি তিন স্প্যানিশ সঙ্গীকে নিয়ে মুক্তি লাভ করেন এবং নতুন করে যাত্রা শুরু করেন।

‘অলৌকিক চিকিৎসক’ হিসেবে খ্যাতি

অভিযানের সময় এক অসুস্থ আদিবাসী নারীকে সুস্থ করে তোলার ঘটনায় এস্তেভ্যানিকো ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তিনি একজন চিকিৎসক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিতি পান।

এ কারণে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতাই দলটির নিরাপদ অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করে।

নতুন ভূখণ্ডের পথ উন্মোচন

মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছানোর পর এস্তেভ্যানিকোর খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। ১৫৩৯ সালে নিউ স্পেনের প্রশাসন তাঁকে উত্তরাঞ্চলে ‘সেভেন সিটিস অব গোল্ড’ বা স্বর্ণনগরীর কিংবদন্তি অনুসন্ধানের অভিযানে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এই অভিযানে তিনি বর্তমান নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনা অঞ্চলে প্রবেশকারী প্রথম অ-আদিবাসী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর অভিযাত্রা পরবর্তী সময়ে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিস্তারের পথ তৈরি করে।

রহস্যময় মৃত্যু

স্বর্ণনগরীর সন্ধানে অভিযানের সময় তিনি জুনি জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত হাউইকুহ এলাকায় প্রবেশ করেন। ইতিহাসের প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, সেখানেই স্থানীয়দের হাতে তিনি নিহত হন।

যদিও কাঙ্ক্ষিত সোনার শহরের অস্তিত্ব কখনো পাওয়া যায়নি, তবে তাঁর শেষ অভিযান আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্প্যানিশ প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি গড়ে দেয়।

বিলম্বিত স্বীকৃতি

দীর্ঘ সময় ধরে এস্তেভ্যানিকোর নাম ইতিহাসের মূলধারা থেকে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে গবেষণা ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ড. হুসেইন ইলাহিয়ানে তাঁকে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাথমিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

২০১৬ সালে টেক্সাস স্টেট ক্যাপিটল ভবনে তাঁর স্মরণে সাত ফুট উচ্চতার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়। এটি টেক্সাস অঞ্চলে আগত প্রথম আফ্রিকানদের একজন হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাদুঘর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে এস্তেভ্যানিকোর জীবন ও অবদান তুলে ধরা হচ্ছে। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি শুধু একজন অভিযাত্রী নন, বরং ভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এক অনন্য সেতুবন্ধন ছিলেন।

মরোক্কান-আমেরিকান লেখক লায়লা লালামির ভাষায়, এস্তেভ্যানিকোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি বিজয়ী ও বিজিত, উভয় বিশ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক চরিত্র, যার জীবনকাহিনি আজও বিস্ময় জাগায়।