গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ নদী, চরভূমি, কৃষিনির্ভর জনজীবন এবং ঐতিহাসিক নদীপথকে ঘিরে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীবেষ্টিত এ জেলায় প্রকৃতি, ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনধারাকে একসঙ্গে উপভোগের সুযোগ থাকলেও এখনো পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে গাইবান্ধা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় নদীভিত্তিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের ফুলছড়ির বালাসী ঘাট জেলার সবচেয়ে পরিচিত নদীভিত্তিক ভ্রমণকেন্দ্র। যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর, নৌভ্রমণ এবং সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সারা বছরই ভ্রমণপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা-দিনাজপুর রেল-ফেরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই ঘাট, যা স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও বাড়িয়েছে।
জেলার প্রায় ৬৪ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধও পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময়। বাঁধের দুই পাশের সবুজ পরিবেশ, নদীর দৃশ্য এবং শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা চর ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এ সময় নৌভ্রমণের পাশাপাশি চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়িতে ঘোরার সুযোগও পাওয়া যায়।
গাইবান্ধার কঞ্চিপাড়ায় অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্যও জেলার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নদীভ্রমণের সঙ্গে এই স্থাপনাটি যুক্ত হলে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে ১৬৫টি চর ও দ্বীপচর। এসব এলাকায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। নদীভাঙনের সঙ্গে সংগ্রাম করেও তারা পলিমাটিতে বছরে ২০টির বেশি ফসল উৎপাদন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৃষিনির্ভর জীবনধারাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষিভিত্তিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী ও চর গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, নদীভ্রমণের সঙ্গে কৃষিজীবন যুক্ত করা গেলে পর্যটকেরা চরাঞ্চলের কৃষিকাজ ও গ্রামীণ জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের কৃষক আবদুল মান্নানের মতে, পর্যটকেরা ফসল ও স্থানীয় পণ্য কিনলে চরবাসীর আয়ও বাড়বে।
স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিরাপদ জেটিঘাট, পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, আবাসন ও পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে বালাসী ঘাটকে কেন্দ্র করে সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নদীভিত্তিক পর্যটন রুট তৈরি করা সম্ভব।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই রুটে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফেরিঘাট টার্মিনালও নদীর নাব্যতা সংকটে কার্যত ব্যবহার হচ্ছে না। এছাড়া অনেক চরাঞ্চলে যেতে এখনো নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় এবং সড়ক, জেটিঘাট ও জরুরি সেবার ঘাটতি রয়েছে।
পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল বলেন, নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। তাই টেকসই নদীশাসন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন গড়ে তোলা কঠিন।