ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের পর্যটন ও বিনোদন খাতে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য প্রাণচাঞ্চল্য। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে সিলেটের রিসোর্ট, গাজীপুরের অবকাশকেন্দ্র এবং রাজধানীর আশপাশের থিম পার্কগুলোতে ছিল দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক বছরের মন্দাভাব কাটিয়ে এবার ঈদের ছুটিতে ব্যবসা প্রত্যাশার তুলনায় ভালো হয়েছে।
চলতি বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাত দিনের সরকারি ছুটি ছিল। পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিও সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে দেশের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্রে বেড়েছে বুকিং এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের আগে থেকেই দেশের বড় পর্যটন শহর ও অবকাশকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আগাম বুকিং ছিল। ঈদের পরও নতুন বুকিং অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি সপ্তাহজুড়েই এই ব্যস্ততা অব্যাহত থাকবে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, অর্থনৈতিক চাপের কারণে গত কয়েক বছরে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। তবে গত বছর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়। রোজার ঈদে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর কোরবানির ঈদেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ফ্যান্টাসি কিংডমে দর্শনার্থীর ভিড়, পিছিয়ে নন্দন পার্ক
ঈদের ছুটিতে আশুলিয়ার জনপ্রিয় থিম পার্ক ফ্যান্টাসি কিংডমে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে এবারও বিভিন্ন মূল্যসাশ্রয়ী টিকিট ও কম্বো প্যাকেজ চালু করে কর্তৃপক্ষ। একক টিকিটের মূল্য ছিল ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে।
পার্কটির পরিচালনাকারী কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট জানিয়েছে, গত বছরের কোরবানির ঈদের তুলনায় এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। দৈনিক প্রায় সাত হাজার দর্শনার্থী ধারণক্ষমতার এই পার্কে ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ ভ্রমণ করেছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত চট্টগ্রামের ফয়’স লেকেও প্রতিদিন সাত থেকে আট হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে।
কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা অনুপ কুমার সরকার বলেন, ঈদের ছুটিতে তাঁদের বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের চাপ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সেবার মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আশুলিয়ার আরেক জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র নন্দন পার্কে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। পার্কটির কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তুতি ভালো থাকলেও দর্শনার্থীর সংখ্যা আশানুরূপ ছিল না। ১০ হাজারের বেশি দৈনিক ধারণক্ষমতার এই পার্কে ছুটির সময় গড়ে প্রায় দুই হাজার দর্শনার্থী এসেছেন।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রতিদিন লাখো মানুষের সমাগম
ঈদের ছুটিতে রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানা পরিণত হয় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণকেন্দ্রে। পরিবার, শিশু ও তরুণদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল পুরো এলাকা।
বিশেষ করে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে পরিচিতি পাওয়া আলবিনো মহিষটিকে দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিনই এক লাখের বেশি দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছেন। জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিটমূল্য হিসেবে প্রতিদিন ৫০ লাখ টাকারও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে।
হোটেল ও রিসোর্টে উচ্চমাত্রার বুকিং
ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার, গাজীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্রে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
গাজীপুরের সোহাগ পল্লী ও রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মাসুদ আলম জানান, ঈদের পরদিন থেকে তাঁদের রিসোর্ট শতভাগ বুকিং অবস্থায় রয়েছে। আগামী শনিবার পর্যন্ত একই পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
সিলেট অঞ্চলের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল সড়কের নাইটেশ্বরে অবস্থিত দুসাই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পার এক কর্মকর্তা জানান, শনিবার পর্যন্ত রিসোর্টটির ৮০ শতাংশের বেশি কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে।
হবিগঞ্জের বাহুবলে অবস্থিত বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র দ্য প্যালেসেও ঈদ উপলক্ষে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের মতো এবারও সন্তোষজনক ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
কক্সবাজার থেকে সাদাপাথর, পর্যটকের পদচারণায় মুখর গন্তব্যগুলো
ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, সিলেটের সাদাপাথর, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছিল ভ্রমণপিপাসু মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি। গরম আবহাওয়ার মধ্যেও অনেকে সমুদ্রস্নান ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটিয়েছেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ ছুটি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানুষের ভ্রমণ আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাজার আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের মৌসুমগুলোতেও পর্যটন শিল্পে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।