দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় বছরজুড়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় থাকে। তবে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জরুরি সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে নিরাপত্তা অবকাঠামো জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

সরকারি ছুটি, সাপ্তাহিক অবকাশ ও উৎসবের সময় সৈকতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই তুলনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভ্রমণকারীদের। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড ও নির্দেশনামূলক ব্যবস্থা নেই বলে তারা জানান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জোয়ারের সময় উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোত উপেক্ষা করে অনেক পর্যটক গভীর পানিতে নেমে পড়েন। কিন্তু তাদের সতর্ক করা কিংবা দুর্ঘটনার সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সবসময় প্রস্তুত থাকে না। এতে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে স্থানীয় ফটোগ্রাফার, মোটরসাইকেল গাইড ও স্পিডবোটচালকদেরই উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসতে হয়। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই মানবিক কারণে তারা এই দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় মোটরসাইকেল গাইড আ. রহিম বলেন, ‘সৈকতে কোনো পর্যটক ঢেউয়ে বিপদে পড়লে অনেক সময় মোটরসাইকেল গাইড, ফটোগ্রাফার ও স্থানীয়রাই আগে ছুটে যাই। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড না থাকায় আমাদেরই উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের কাজের জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম নেই। তাই দ্রুত স্থায়ীভাবে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নিয়োগ দেওয়া জরুরি।’

স্থানীয় ফটোগ্রাফার আ. জলিল বলেন, ‘প্রতিদিন সৈকতে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক পর্যটককে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যেতে দেখি। কেউ স্রোতে পড়ে গেলে বা বিপদে পড়লে স্থানীয়রাই উদ্ধারকাজে নেমে পড়ি। এটি আমাদের দায়িত্ব নয়, তবুও মানবিক কারণে করতে হয়। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড থাকলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেক কমে যেত।’

খুলনা থেকে আসা পর্যটক সাইমুন বলেন, ‘বিশ্বের উন্নত সমুদ্রসৈকতগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর লাইফগার্ড টাওয়ার, রঙভিত্তিক সতর্কতামূলক পতাকা, নিয়মিত মাইকিং এবং জরুরি সহায়তা কেন্দ্র থাকে। অথচ কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে এসব ব্যবস্থা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই অপ্রতুল।’

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রসৈকতে লাইফগার্ড, সতর্কতামূলক পতাকা, তথ্যকেন্দ্র, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা পর্যটকদের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সুবিধা শক্তিশালী হলে পর্যটকদের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি গন্তব্যটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু বলেন, ‘কুয়াকাটা আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, সতর্কীকরণ পতাকা, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, তথ্যকেন্দ্র এবং নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়বে।’

টুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পর্যটকদেরও সতর্কতামূলক নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।’

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • পর্যাপ্ত লাইফগার্ডের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড অপর্যাপ্ত
  • স্থানীয়দেরই অনেক সময় উদ্ধারকাজে অংশ নিতে হচ্ছে
  • আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা অবকাঠামোর দাবি জোরালো
  • পর্যটকদের সচেতনতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন