ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে পর্যটকদের ভিড়ের প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ীদের। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। হোটেল ও রিসোর্টে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় ঘোষণা করা হলেও আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ট্রেনের টিকিট সংকট, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পর্যটক শেষ মুহূর্তে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। ফলে ঈদের ছুটিতেও শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি।
তবে পর্যটক কম থাকায় অনেক ভ্রমণপিপাসু নিরিবিলি পরিবেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত ভিড় না থাকায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা আরও সহজ হয়েছে।
মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, খাসিয়াপুঞ্জি, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স এবং পৃথিমপাশা নবাববাড়ি। প্রতি বছর ঈদ, পূজা ও দীর্ঘ ছুটিতে এসব স্থানে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে।
ঈদের পরদিন পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসেন ঢাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, “চা-বাগানের সবুজ সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থা এবং যানবাহনের বিশৃঙ্খলার কারণে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।”
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক সুমনা বেগম বলেন, “পরিবার নিয়ে কয়েকদিনের জন্য শ্রীমঙ্গলে এসেছি। চা-বাগান, বনাঞ্চল ও লেক ঘুরে দেখেছি। সবুজ প্রকৃতির মাঝে সময়টা খুব ভালো কেটেছে।”
পর্যটক কমার পেছনে একাধিক কারণ
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এবার পর্যটক কম আসার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ, অতিবৃষ্টি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং যাতায়াতের নানা সমস্যার প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতে।
রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রিনিউর অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেকেই বাইরে ঘোরাঘুরির বদলে রিসোর্টেই সময় কাটিয়েছেন।
মৌলভীবাজার পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, “ঈদ উপলক্ষে হোটেল-রিসোর্টগুলোতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবুও প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক আসেননি। তবে প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। কয়েক মাস ধরেই পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুরবস্থা এবং পর্যটন এলাকার সংযোগ সড়কের খারাপ অবস্থা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। পাশাপাশি অতিবৃষ্টি ও অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ।”
বাড়ছে রিসোর্ট, বাড়ছে প্রতিযোগিতা
রাধানগর নিসর্গ নিরব ইকো-কটেজের মালিক কাজী শামছুল হক বলেন, শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায় সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। জেলায় বর্তমানে শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে এবং নতুন করে আরও অনেক স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, “সড়কে যানজট এবং ট্রেনের টিকিট সংকটের কারণে অনেক পর্যটক মৌলভীবাজারে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ঢাকা-সিলেট রেলপথে পর্যটকবান্ধব নতুন ট্রেন চালু করা হলে পর্যটক বাড়তে পারে।”
শ্রীমঙ্গলের পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের মহাব্যবস্থাপক আরমান খান বলেন, “এবার প্রায় সব হোটেল-রিসোর্টই বিশেষ ছাড় দিয়েছে। তারপরও প্রত্যাশিত পর্যটক পাওয়া যায়নি। তবে গত ঈদুল ফিতরে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল।”
বিদেশি পর্যটকের ধরনে পরিবর্তন
সিনিয়র ট্যুর গাইড সৈয়দ রিফাত জামান বলেন, বর্তমানে উচ্চ আয়ের বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে স্বল্প ব্যয়ের বিদেশি ভ্রমণকারীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে।
তার ভাষ্য, “বাংলাদেশে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াত ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগী পর্যটন গন্তব্যগুলোর তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। ফলে কম বাজেটের বিদেশি পর্যটকরা আগের মতো আসছেন না।”
তিনি আরও জানান, অনেক দেশি পর্যটক খরচ কমাতে দিনের মধ্যেই দর্শনীয় স্থান ঘুরে আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে আবাসন খাতে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।
লাউয়াছড়ায় দুই হাজারের বেশি দর্শনার্থী
লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক জানান, ঈদের তৃতীয় দিনে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২ হাজার ৬৩৬ জন দর্শনার্থী টিকিট কেটে জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংখ্যা আগের বছরের ঈদ মৌসুমের তুলনায় খুব বেশি নয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর
মৌলভীবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. কামরুল চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “পর্যটন এলাকাগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। যানজট নিরসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি নেই।”
পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় দর্শনীয় স্থানের আকর্ষণ এখনও অটুট রয়েছে। তবে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং ভ্রমণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পর্যটক সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।