কোরবানির ঈদের ছুটিতে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। ঈদের দিন বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া মানুষের আগমন শুক্রবার দ্বিতীয় দিনে এসে রীতিমতো উপচেপড়া ভিড়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট এখন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর।
লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, সীগাল, দরিয়ানগর, ইনানী ও হিমছড়ি পয়েন্টজুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছিল পর্যটকদের সরব উপস্থিতি। পরিবার-পরিজন, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন সমুদ্র নগরীতে। ফলে সৈকতের পাশাপাশি শহরের প্রধান সড়কগুলোতেও বেড়েছে যানজট ও ভোগান্তি।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পর্যটকদের ভিড়ে পুরো শহর যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক মাসের তুলনায় এবারের ঈদে পর্যটকের চাপ অনেক বেশি।
সৈকতে আনন্দ-উচ্ছ্বাস
সৈকতের বালুচরে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শিশু-কিশোররা সাগরের ঢেউয়ে জলকেলিতে মেতে ওঠে। কেউ ঘোড়ায় চড়ছেন, কেউ বিচ বাইক চালাচ্ছেন, আবার অনেকে পরিবার নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিশেষ করে বিকালের পর সৈকতে ভিড় আরও বাড়ে। সূর্যাস্ত উপভোগ করতে হাজারো মানুষ জড়ো হন সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা আলোকসজ্জা ও মানুষের কোলাহলে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সৈকতের আশপাশের ফুচকা, ঝালমুড়ি, ডাব, ভাজাপোড়া ও সামুদ্রিক খাবারের দোকানগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
হোটেল-মোটেলে কক্ষ সংকট
পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপের কারণে কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস ও রিসোর্টের কক্ষ পূর্ণ হয়ে গেছে। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী এলাকার বড় হোটেলগুলো ঈদের আগেই অগ্রিম বুকিং সম্পন্ন করে।
তবে হোটেল ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, প্রত্যাশার তুলনায় এখনও পর্যটক কম। তাদের ধারণা, ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় আগামী কয়েক দিনে আরও বেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন।
কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান বলেন, ঈদের আগে থেকেই বুকিং ছিল। তবে এখনও আশানুরূপ পর্যটক আসেনি। ছুটির বাকি দিনগুলোতে আরও বড় সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক মাহবুবুর রহমান বলেন, কোরবানির ব্যস্ততা শেষে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটাতে কক্সবাজারে এসেছি। সমুদ্রের পরিবেশ খুব ভালো লাগছে, যদিও ভিড় অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম থেকে আসা কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। সৈকতের পরিবেশ খুব প্রাণবন্ত। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা উৎসবের মতো লাগে।
রাজশাহী থেকে আগত ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, প্রতি ঈদেই কক্সবাজারে আসি। তবে এবারের মতো এত ভিড় আগে খুব কম দেখেছি।
ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি
পর্যটকদের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক, ঘোড়ার মালিক ও খাবার বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সুগন্ধা পয়েন্টের ভ্রাম্যমাণ দোকানি সোহেল রানা বলেন, অনেকদিন পর ভালো ব্যবসা হচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ আসছে। বিক্রিও ভালো।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ ঈদ ছুটির কারণে এখনও অনেকে কক্সবাজারের পথে রয়েছেন। ফলে আগামী কয়েক দিনেও পর্যটকদের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব, জেলা পুলিশ ও লাইফগার্ড সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহলও জোরদার করা হয়েছে।
সমুদ্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নামা থেকে পর্যটকদের সতর্ক করছেন লাইফগার্ড সদস্যরা।
ট্যুরিস্ট কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
যানজট ও ভোগান্তি
অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে কলাতলী, লাবণী ও ঝাউতলা এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানবাহনের সারি লক্ষ্য করা গেছে।
কিছু পর্যটক অতিরিক্ত ভিড় ও হোটেল ভাড়ার উচ্চমূল্য নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে এসবের মধ্যেও ঈদের আনন্দে মেতে উঠেছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
সমুদ্রের গর্জন, বালুচরের সৌন্দর্য এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটিয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত উপভোগ করছেন তারা।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদের পুরো ছুটিজুড়েই কক্সবাজারে এমন প্রাণচাঞ্চল্য অব্যাহত থাকবে। এতে দেশের পর্যটন খাতেও নতুন গতি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।