বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ। ২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালুর সময় বাদ দেওয়া এই ঘোষণা পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।’ ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতিগত অবস্থান থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে শুধু ইসরায়েল নয়, একসময় বাংলাদেশি পাসপোর্টে আরও দুটি দেশের নামও ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশি পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘ইসরায়েল, তাইওয়ান এবং রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকা ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।’
কেন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাইওয়ানের নাম
দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী ‘অ্যাপার্থাইড’ শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল বাংলাদেশ। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি ঢাকা। এ কারণেই পাসপোর্টে দেশটির নাম উল্লেখ করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান এবং নেলসন ম্যান্ডেলার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। পরে পাসপোর্ট থেকেও দেশটির নাম বাদ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ শুরু থেকেই ‘এক চীন নীতি’ সমর্থন করে আসছে। চীনের অবস্থান অনুযায়ী তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় বাংলাদেশি পাসপোর্টে আশির দশক পর্যন্ত তাইওয়ানের নামও ‘ব্যতীত’ তালিকায় ছিল।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা বদলালে ধীরে ধীরে তাইওয়ান ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাম বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত শুধু ইসরায়েলের নামই থেকে যায়।
২০২০ সালে কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল
২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালুর সময় ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি সরিয়ে নেওয়া হয়। তখন সরকার বলেছিল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে সরকার আবারও আগের অবস্থানে ফিরছে।
অন্য দেশেও আছে এমন নজির
বাংলাদেশ একমাত্র দেশ নয়, যারা পাসপোর্টে নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেয়।
পাকিস্তানি পাসপোর্টেও লেখা থাকে, ‘এই পাসপোর্ট ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।’
এ ছাড়া আলজেরিয়া, লেবানন, ইরানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না। এসব দেশের নাগরিকদের সরাসরি ইসরায়েল ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রও কিউবা, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম ও চীনের মূল ভূখণ্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিজ নাগরিকদের জন্য বিশেষ অনুমতির বিধান চালু করেছিল। এখনো উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একসময় কিউবাও নিজ নাগরিকদের বিদেশ সফরে বিশেষ অনুমতির বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছিল।
পাসপোর্টে ‘ব্যতীত’ লেখা থাকলে কী হয়
কোনো দেশের পাসপোর্টে আরেকটি দেশের নাম উল্লেখ করে ‘ব্যতীত’ লেখা হলে তার অর্থ হলো, ওই পাসপোর্ট নির্দিষ্ট দেশটিতে ভ্রমণের জন্য বৈধ নয়।
বাংলাদেশ যদি আবারও পাসপোর্টে ইসরায়েলে ভ্রমণ নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দেয়, তাহলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সেখানে যাওয়া দেশের পাসপোর্ট আইন লঙ্ঘনের শামিল হবে।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি ঠেকানো সবসময় সহজ নয়।
কীভাবে অনেকেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যান
বাংলাদেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দিলেও ইসরায়েল চাইলে বাংলাদেশি নাগরিককে ভিসা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পাসপোর্টে সিল না মেরে আলাদা কাগজে ভিসা বা প্রবেশ অনুমতি দেওয়া হয়। এটিকে সাধারণভাবে ‘পেপার ভিসা’ বলা হয়।
ফলে সফর শেষে পাসপোর্ট দেখে সহজে বোঝা যায় না যে কেউ ইসরায়েল সফর করেছেন।
এ ছাড়া অনেক বাংলাদেশির দ্বিতীয় নাগরিকত্বও থাকে। তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইসরায়েল ভ্রমণ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পাসপোর্টের বিধিনিষেধ কার্যকর হয় না।
অতীতেও যখন দক্ষিণ আফ্রিকা বা তাইওয়ানের নাম বাংলাদেশি পাসপোর্টে ছিল, তখন অনেকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সেখানে যেতেন। সাধারণত হংকং, ব্যাংকক বা অন্য কোনো ট্রানজিট শহর ব্যবহার করা হতো। সরাসরি ফ্লাইট না থাকা এবং পাসপোর্টে সিল না মারার কারণে বাস্তবে এসব ভ্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।