দক্ষিণ কোরিয়ার উপকূলীয় শহর বুসানে এমন একটি খাবার আছে, যার নাম শুনলেই অনেকের মনে ভয় কাজ করে। কারণ এটি তৈরি হয় পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত মাছ পাফারফিশ দিয়ে। সামান্য ভুলেই যার বিষ প্রাণঘাতী হতে পারে।
তবুও এই মাছ দিয়েই তৈরি হওয়া ‘বকগুক’ বা পাফারফিশ স্যুপ এখন বুসানের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। শুধু স্থানীয়রাই নন, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরাও এই খাবারের স্বাদ নিতে ভিড় করেন শহরটির নামিদামি রেস্তোরাঁগুলোতে।
পাফারফিশের শরীরে থাকে টেট্রোডোটক্সিন নামে শক্তিশালী বিষ। এটা এতটাই মারাত্মক যে, অল্প পরিমাণও মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে প্রশিক্ষিত রাঁধুনিরা মাছটির বিষাক্ত অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলাদা করে ফেলেন।
চোখ, হাড় ও বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সরিয়ে ফেলা হয় রান্নার আগে। এমনকি মাছের রক্তেও সামান্য বিষ থাকায় সেটিও খুব যত্ন করে পরিষ্কার করা হয়।
এই কাজের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সরকারি লাইসেন্স প্রয়োজন। রেস্তোরাঁয় গেলে অনেক সময় সেই সনদ দেয়ালেই ঝুলতে দেখা যায়। ফলে ভয় পেলেও অতিথিরা বুঝতে পারেন, তারা দক্ষ হাতেই আছেন।
বুসানের মিপো এলাকা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘পাফারফিশ ভিলেজ’ নামে। এখানকার বহু রেস্তোরাঁ ইতোমধ্যেই মিশেলিন স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একটি হলো চাওন বকগুক। রেস্তোরাঁটির প্রতিষ্ঠাতা কিম ডং-সিক ছিলেন বুসানের প্রথম লাইসেন্সধারী পাফারফিশ শেফ।
এখানকার জনপ্রিয় খাবার হলো গরম ধোঁয়া ওঠা বকগুক স্যুপ। এতে থাকে পাফারফিশের মাংস, মুলা, বিন স্প্রাউট ও ওয়াটার পার্সলের মতো সবজি। সঙ্গে পরিবেশন করা হয় কিমচি, ভাত ও বিভিন্ন কোরিয়ান সাইড ডিশ। অনেকের মতে, এই স্যুপ হ্যাংওভার কাটাতেও বেশ কার্যকর।
তবে চাওন বকগুক শুধু খাবারের জন্যই বিখ্যাত নয়। ১৯৯২ সালে এখানেই ঘটে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা। স্থানীয় রাজনীতিকদের গোপন বৈঠালে আড়িপাতার ঘটনা নির্বাচনের ঠিক আগে ফাঁস হয়ে যায় এবং তা বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়। আজও ঘটনাটি ‘চাওন বকগুক ইনসিডেন্ট’ নামে পরিচিত।
পাফারফিশ খাওয়ার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনে শত শত বছর ধরে এটি খাওয়া হয়ে আসছে। তবে অতীতে বিষক্রিয়ায় বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণেই অনেক পরিবারে এখনো এই মাছ খাওয়া নিয়ে ভয় ও কুসংস্কার রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে। বর্তমানে বুসানের অধিকাংশ রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত পাফারফিশ আসে বিশেষ খামার থেকে। গবেষকরা দেখেছেন, মাছটির বিষাক্ততা অনেকটাই নির্ভর করে তার খাদ্যের ওপর। নিয়ন্ত্রিত খাদ্য দিয়ে বড় করা হলে মাছ প্রায় বিষমুক্ত হয়ে ওঠে।
তবুও রহস্য আর ভয় পুরোপুরি হারায়নি। বরং সেই ভয়ই যেন এই খাবারের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ অনেকের কাছে পাফারফিশ শুধু একটি খাবার নয়, বরং সাহস, ঐতিহ্য ও রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা।
আর বুসান? সমুদ্র, মাছের বাজার আর এই বিখ্যাত স্যুপকে ঘিরে শহরটি এখন দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণগন্তব্য হয়ে উঠছে।