অনেকের কাছেই উড়োজাহাজ ভ্রমণ আনন্দের নয়, বরং উদ্বেগের বিষয়। বিমানে ওঠার আগেই কেউ কেউ আতঙ্কে ভোগেন। বিশেষ করে টার্বুলেন্স, অ্যালার্ম বা ফ্লাইট বিলম্বের মতো পরিস্থিতি তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে অভিজ্ঞ পাইলটদের মতে, আধুনিক বিমানযাত্রা বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থাগুলোর একটি।

সম্প্রতি ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিন ট্রাভেল+লিজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিমানযাত্রার ভয় কাটাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ক্যাপ্টেন সাঙ্গে ওয়াংচুক। তিনি বিশ্বের অন্যতম কঠিন বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত ভুটানের পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান পরিচালনার অনুমতিপ্রাপ্ত অল্প কয়েকজন পাইলটের একজন।

হিমালয়ের প্রায় ১৮ হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড়ঘেরা সংকীর্ণ পথ দিয়ে পারো বিমানবন্দরে অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে হয়। এ কারণে বিমানবন্দরটি বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং রানওয়েগুলোর মধ্যে ধরা হয়। ৩৫ বছরের অভিজ্ঞ এই বৈমানিক মনে করেন, যাত্রীদের আতঙ্কের বড় কারণ হলো বিমান পরিচালনার ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা।

কঠোর প্রশিক্ষণের ওপর ভরসা রাখুন

ক্যাপ্টেন ওয়াংচুকের মতে, পাইলটদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক। আধুনিক পাইলটদের নিয়মিত সিমুলেটর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

তিনি বলেন, যাত্রীরা যখন উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন ককপিটে থাকা পাইলট একই পরিস্থিতির জন্য বহুবার প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত থাকেন। তাই পাইলটের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রযুক্তি ও মানুষের সমন্বয়েই নিরাপত্তা

বর্তমান সময়ের বিমানগুলোতে বহু স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবে শেষ সিদ্ধান্তটি মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে।

ক্যাপ্টেন ওয়াংচুক জানান, বিমান অনেক কাজ নিজে থেকে করতে পারলেও কখন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে হবে, তা একজন অভিজ্ঞ পাইলটই নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও মানবিক পর্যবেক্ষণের সমন্বয়েই নিরাপদ উড্ডয়ন নিশ্চিত হয়।

আধুনিক বিমানে রয়েছে শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক উড়োজাহাজে একাধিক ব্যাকআপ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। বিদ্যুৎ বা হাইড্রোলিক সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিলেও বিকল্প ব্যবস্থা সক্রিয় হয়।

ক্যাপ্টেন ওয়াংচুক বলেন, বিমানকে নির্দিষ্ট সীমার বাইরে কাত করতে চাইলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারসাম্যে ফিরে আসে। এমনকি ভুলবশত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলেও আধুনিক প্রযুক্তি তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

যাত্রীরা যা দেখেন না

বিমানযাত্রার সময় যাত্রীরা কেবল নিজেদের অভিজ্ঞতাই অনুভব করেন। কিন্তু ককপিটে পাইলটদের সামনে থাকে আরও বিস্তৃত তথ্য ও সতর্কতা ব্যবস্থা।

আবহাওয়ার রাডার, আগের ফ্লাইটের রিপোর্ট এবং গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাইলটরা সিদ্ধান্ত নেন। কোথাও বায়ুচাপ বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতা পরিবর্তন করা হয়।

ক্যাপ্টেনের ভাষায়, যাত্রীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ককপিটে কত প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ চলছে।

ফ্লাইট বিলম্ব সব সময় খারাপ নয়

আবহাওয়া বা যান্ত্রিক কারণে ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীরা বিরক্ত হন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিরাপত্তাব্যবস্থারই অংশ।

ক্যাপ্টেন ওয়াংচুক বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঝুঁকি না নিয়ে ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ দেরি হওয়া মানেই নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অ্যালার্ম শুনলেই আতঙ্ক নয়

ককপিটে বিভিন্ন ধরনের সতর্কসংকেত বা অ্যালার্ম বেজে উঠতে পারে। তবে সব অ্যালার্মই বিপদের ইঙ্গিত নয়।

পাইলটদের কাছে এসব সংকেত অনেক সময় শুধুই তথ্য বা সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে।

টার্বুলেন্সকে স্বাভাবিকভাবে নিন

বিমান কাঁপলে অনেক যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু অভিজ্ঞ পাইলটদের কাছে টার্বুলেন্স একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

ক্যাপ্টেন ওয়াংচুক বলেন, আকাশের বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণেই সাধারণত এমন কম্পন হয়। বিমানগুলো এসব পরিস্থিতি মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়। তাই সামান্য টার্বুলেন্সে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।