বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতি বছর লাখো পর্যটকের সমাগম হলেও এখনো গড়ে ওঠেনি পূর্ণাঙ্গ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। ডুবে যাওয়া, হিটস্ট্রোক, পানিবাহিত সংক্রমণ, খাদ্যে বিষক্রিয়া কিংবা ঘূর্ণিঝড়জনিত দুর্ঘটনার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা না থাকায় বাড়ছে ঝুঁকি। এমন বাস্তবতায় কক্সবাজারে বিচ হেলথ সেন্টার স্থাপনের সরকারি উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি এবং শীত মৌসুমে কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সমুদ্রস্নান, ওয়াটার স্পোর্টস ও অবকাশযাপনের জন্য দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই গন্তব্যে পর্যটন অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও নিরাপত্তা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়।

সম্প্রতি সরকার কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বিচ হেলথ সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসা সেবা উন্নত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান নিরাপত্তা নীতিমালা সংস্কার জরুরি। এ লক্ষ্যে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকদের দ্রুত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা আসবে এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সহজ হবে।

বিশ্বের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতভিত্তিক পর্যটন গন্তব্যগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এখন পর্যটন ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ। থাইল্যান্ডের ফুকেটে লাইফগার্ড টাওয়ার, ফার্স্ট এইড স্টেশন, অ্যাম্বুলেন্স ও সমন্বিত জরুরি চিকিৎসা নেটওয়ার্ক চালু রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বন্ডাই বিচেও স্থায়ী লাইফগার্ড টহল, সার্ফ রেসকিউ সেবা এবং দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।

এছাড়া গোয়া, বালি ও সেন্টোসার মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বিচসাইড মেডিকেল সাপোর্ট ও পর্যটক ক্লিনিক রয়েছে, যেখানে ডুবে যাওয়া, পানিশূন্যতা, সার্ফিং দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে ডুবে যাওয়া, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ওয়াটার স্পোর্টস দুর্ঘটনা, খাদ্যে বিষক্রিয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা অনেক সহজ হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ডুবে মৃত্যু বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে উপকূলীয় পর্যটন এলাকায় দ্রুত জরুরি সাড়া ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।

কক্সবাজারে সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০১২ সাল থেকে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ এবং রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘সি সেফ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে লাইফগার্ড সেবা দেওয়া হচ্ছে।

সি সেফ লাইফগার্ড ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিচ হেলথ সেন্টার স্থাপন দীর্ঘদিনের দাবি। গত ১২ বছরে তাদের টিম ১ হাজার ৮ জন পর্যটককে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছে।

তার ভাষ্য, সৈকতে প্রায়ই ডুবে যাওয়া ছাড়াও নানা ধরনের মেডিকেল জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ পর্যটকদের অনেক সময় অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে হাসপাতালে নিতে হয়। আবার সবসময় অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, “অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অচেতন হয়ে পড়েন। সৈকতের পাশে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স থাকলে আরও অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।”

বর্তমানে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির একটি অ্যাম্বুলেন্স লাবণী পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল পর্যটক সামাল দিতে লাবণী, কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে অন্তত পৃথক জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ও অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু ডুবে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সৈকতসংলগ্ন পানিতে বর্জ্য ও ড্রেনেজ দূষণের কারণে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

জার্নাল অব দ্য সিলেট এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলীয় পানিতে মাইক্রোবিয়াল দূষণের তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দূষিত সমুদ্রের পানি ত্বকের রোগ, পেটের অসুখ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এদিকে জলবায়ু ঝুঁকিও বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূল ক্ষয় ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কক্সবাজারে প্রতিবছরই পর্যটক ও স্থানীয়রা নানা দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তারেক মোহাম্মদ মোর্তজা হাসান বলেন, আধুনিক বিচ ম্যানেজমেন্ট এখন শুধু সৌন্দর্যায়ন বা হোটেল নির্মাণে সীমাবদ্ধ নেই। টেকসই পর্যটনের জন্য লাইফগার্ড ব্যবস্থা, উদ্ধারসেবা ও বিচ হেলথ সেন্টার অপরিহার্য অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।