এখনো চোখের সামনে ভাসছে থাইল্যান্ড। মাসখানেক হয়ে গেলো ঘুরে এসেছি থাইল্যান্ড থেকে। পিয়াচলের এটা ড্রিম ট্রিপ। পিয়াচল মানে আমার নাম পিয়াস আর আমার স্ত্রীর নাম আঁচল।

দেশে আমরা ঘুরেছি প্রচুর। সবগুলোই ছিল বাজেট টুর। মানে আমাদের ঘোরা চাকচিক্যতা নয়, উদ্দেশ্য শুধু দেখা নয় এক্সপ্লোর করা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও ডানা মেলে উড়েছি। থাইল্যান্ড আমাদের একসঙ্গে দ্বিতীয় বিদেশ ভ্রমণ। যদিও আমার আরও কিছু দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে।

ঘুরতে গেলেই প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় আসে, ওয়ালেটে কত টাকা আছে। দেশের আইকনিক ভ্রমণ স্থান কক্সবাজার। কিন্তু এটা শুধুই ব্যবসার স্থান। তারা টুরিস্টদের কথা ভাবে আর কই। কক্সবাজারে একেকটা মধ্যম মানের রুমের জন্য গুণতে হবে কত টাকা? পিক সিজনে ৪/৫ হাজার টাকা। অফ সিজনে অন্তত ২ হাজার টাকা।

কিন্তু আপনি পাতায় মানসম্মত রুম অফসিজনে পাবেন মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায়। এর থেকেও কমেও মিলবে। তবে চোখ রাখতে হবে অনলাইন বুকিং সাইটগুলোতে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি- এই রুমগুলোর জন্য কক্সবাজারে অফসিজনে গুণতে হবে ৪/৫ হাজার টাকা। সবথেকে বড় কথা নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে না কক্সবাজারের মতো। নিজের মতো ঘুরুন। মধ্য রাতে নির্জন বিচে হাঁটুন। ভয় লাগবে না। কেউ এসে বিরক্তও করবে না। ঝাল চানাচুর এসে চিৎকার করবে না। সাহায্যের জন্য হাত পাতবে না। নিশ্চিতে নামুন বিচে। দেয়া থাকবে নিরাপত্তাবেষ্টনি। কক্সবাজারের মতো বিদেশি দেখে হামলে পরবে না কেউ।

যদি পাতায়া যেতে চান? বিমানবন্দর থেকে নেমেই পাবেন সরাসরি বাস। আধুনিকমানের আরামদায়ক বাস। ১৩০ বাথে নিয়ে যাবে পাতায়ায়। ১ বাথ সমান আনুমানিক ৪ টাকা। সুন্দর সড়ক ধরে চলে যান পাতায়ায়। বাস থেকে নেমে গলা কাটার জন্য বসে থাকবে না কেউ। ডাকও দেবে না। কম খরচে হোটেলে যেতে চান? নিন লেগুনা। আর স্বাচ্ছন্দের জন্য আছে প্রাইভেট কার। আগেই ‘গ্রাব’ নামিয়ে রাখুন।

ঘুরুন মন খুলে। তবে বলব শুধু সমুদ্রই দেখবেন? না; তাদের সংস্কৃতিও অনুভব করুণ। স্থানীয় খাবার টেস্ট  করে দেখুন। একেবারে না খেতে পারলে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টও পেয়ে যাবেন। পাতায়ায় নাইট লাইফ জমজমাট। ওয়াকিং স্ট্রিট থেকে ঘুরে আসুন।

একদিন সময় নিয়ে ঘুরে আসুন কোরাল আইল্যান্ড। মানে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার মতো। সুন্দর-পরিষ্কার, স্বচ্ছ সমুদ্রপথ পেরিয়ে চলে যান আইল্যান্ডে। ভাবলে অবাক হবেন একেকজনের খরচ মাত্র ৩০ বাথ। মানে দু’জনের যাওয়া আসা ১২০ বাথ। সেখানে নেমে লেগুনা নিন। ঘুরে ফিরে দেখুন। প্রতিটি জায়গার ভাড়া তালিকা ঝুলানো আছে। এক বাথও বেশি নেবে না। আমরা দুজনে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখেছি মাত্র ১৬০ বাথে। আর সেন্টমার্টিনে অটো রিকশায় উঠলেই ৫০০ টাকা। ভাবা যায়!

আচ্ছা আপনি কী মোটরসাইকেল চালাতে পারেন? আপনার কী ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? যদি থেকে থাকে আপনার জন্য পাতায়া হাতের মুঠোয়। মাত্র ২০০ বাথে ২৪ ঘন্টার জন্য মোটরসাইকেল আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। বাইকটা ভাড়া নিন আর ঘুরুন প্রাণ খুলে। ভাঙ্গা রাস্তাও নেই, ছিনতাইয়ের ভয়ও নাই। পোশাক নিয়ে কটু কথা বলার লোকও নেই। পাতায়া শুধু দেখতে না, অনুভব করতে যান। শান্তি মিলবে কানে, মস্তিষ্কে। সমুদ্র কেন্দ্রীক একটিভিটিতেও নেই ভয়।

থাইদের ব্যবসাটা আগে নয়। তারা চিন্তা করে আপনার কথা। কারণ তারা জানে আপনি সন্তুষ্ট থাকলে আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও মানুষ আসবে। যা বাড়তে থাকবে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মতো।

খাবার নিয়ে একটু চোখ কান খোলা রাখুন। কারণ সেখানে শুকরের মাংস কমন। তাই তাদের বলুন আপনি শুকরের মাংস খেতে চান না। সব থেকে ভালো হয় ফ্রাইড রাইচ আর চিকেন ফ্রাই খান। ৫০ থেকে ৬০ বাথে আরামচে হয়ে যাবে একবেলার খাবার। খাওয়ার পিছনে টাকা কম খরচ করুন। তবে স্ট্রিট ফুড ট্রাই করতে ভুলবেন না। খুবই কম তেলে সুন্দর ও চমৎকার স্বাধের রান্না থাইরা রাঁধতে পারেন। তাদের সসগুলো ওয়াও।

আর থাইরা অত্যন্ত আন্তরিক, হেল্পফুল। তারা ইংরেজি খুব একটা বোঝেন না। কিন্তু তাদের সিস্টেমটা এমন আপনার প্রশ্নই করতে হবে কম। এরপরও তারা জানে আপনি কী প্রশ্ন করতে পারেন। তারা আপনাকে এক/দুই শব্দে বুঝিয়ে দেবে। তারা পর্যটকদের টাকার খনি না, অতিথি ভাবে। আর থাইল্যান্ড গেলে নিশ্চয়ই শুধু পাতায়া না অন্যান্য স্থানেও যাবেন। যেখানেই ঘুরতে যান না কেনো দুই দিন সময় রাখুন ব্যাংককের জন্য।

শেষ কথায় আসি- কক্সবাজারে অনিশ্চয়তা, ভাড়া যাচাই থেকে শুরু করে নানান চিন্তা মাথায় থাকে। কোথায় গিয়ে ঠকছেন নাতো? তবে থাইল্যান্ডে এটা নাই। পাতায়ায় একদিন ঘুরুন। দুজন মিলে পুরো পাতায়া লেগুনায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঘুরুন ২০০ থেকে ২২০ বাথে। দু’জনের একবেলার জন্য খাবার বাজেট ১০০ থেকে ১২০ বাথ রাখুন। আরেকদিন ঘুরে আসুন কোরাল আইল্যান্ড থেকে। দু’জনের যাওয়া আসা খরচ ১২০ বাথ। আর লেগুনার জন্য রাখুন ১৬০ থেকে ২০০ বাথ। আর সুন্দরভাবে এক্সপ্লোর করতে পারবেন পাতায়া। আর বাইক নিলেতো কথাই নাই। কক্সবাজারে খরচ কেমন আপনিই ভেবে দেখুন। তবে আমি বলব, কক্সবাজারের থেকে অর্থনৈতিক দিক থেকে পাতায়া ভালো। আর বাকী সব দিক যেমন নিরাপত্তা, সৌন্দয্য, প্রশান্তি, নাইট লাইফ সব দিক থেকে পাতায়া অনেক অনেক এগিয়ে। খরচের কথা যদি বলি, মাথায় আসে বিমান ভাড়া। বিমান ভাড়াটা যদি ম্যানেজ করে উঠতে পারেন তবে কক্সবাজার নয় ঘুরে আসুন পাতায়া আই মিন থাইল্যান্ড থেকে। তবেই বুঝতে পারবেন আমাদের আইকনিক কক্সবাজার কোথায় পিছিয়ে আর কতোটা পিছিয়ে। এটাও বুুঝবেন কতোবড় অর্থনৈতিক জোন শুধু মাত্র শৃঙ্খলার কারণে গড়ে উঠছে না।


লেখক পিয়াস সরকার
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন