বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে গোয়া। একসময় ইউরোপীয় ও রুশ পর্যটকদের ভিড়ে মুখর থাকা ভারতের এই জনপ্রিয় সমুদ্র উপকূল এখন অনেকটাই নির্ভরশীল দেশীয় ভ্রমণকারীদের ওপর। বাড়তি খরচ, ভিসা জটিলতা, পরিচ্ছন্নতার সংকট এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সস্তা বিকল্প গন্তব্যের উত্থানে গোয়ার পর্যটন শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

দক্ষিণ গোয়ার পালোলেম সৈকতে দুপুরের রোদ তখন তীব্র। তবু সমুদ্রজুড়ে পর্যটকদের ভিড়। সৈকতঘেঁষা রেস্তোরাঁ, শ্যাক আর স্বল্প খরচের হোটেলগুলোও প্রায় পূর্ণ। তবে কয়েক বছর আগের সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য স্পষ্ট। ইউরোপীয় ও রুশ পর্যটকদের উপস্থিতি এখন চোখে পড়ার মতো কম।

একসময় ‘ভারতের পার্টি রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত গোয়ার সৈকতগুলো বিদেশি ব্যাকপ্যাকারদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য ছিল। ষাট ও সত্তরের দশকের হিপি সংস্কৃতির সময় থেকে পশ্চিমা পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চল বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু বর্তমানে সেই আকর্ষণে ভাটা পড়েছে।

গোয়া পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রায় ৯ লাখ বিদেশি পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করেছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৫ লাখে। বিপরীতে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে স্থানীয় পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৬৮ লাখ, গত বছর তা ১ কোটির বেশি ছাড়িয়েছে।

গোয়ার পর্যটনমন্ত্রী রোহান খাউন্তে সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব বিদেশি পর্যটক প্রবাহে পড়ছে। তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতনের শুরু সাম্প্রতিক যুদ্ধ বা অস্থিরতার অনেক আগেই।

রাশিয়ার এক ব্যালে নৃত্যশিল্পী সোফি, যিনি পঞ্চমবারের মতো গোয়ায় এসেছেন, বলেন, করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিমানভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। ফলে অনেক পর্যটক এখন তুলনামূলক সস্তা গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।

তার ভাষায়, “আমার অনেক বন্ধু এবার গোয়ার বদলে তুরস্ক বা মিসর যাচ্ছে। খরচ কম, যাতায়াতও সহজ।”

যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল থেকে আসা রিকো, যিনি গত দুই দশক ধরে গোয়ায় আসছেন, বলেন ইউরোপে মানুষের ভ্রমণ ব্যয় কমে গেছে। অনেকেই এখন বিদেশের বদলে নিজ দেশেই ছুটি কাটাতে আগ্রহী।

বিদেশি পর্যটকদের আরেকটি বড় অভিযোগ ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে। দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং পাঁচ বছরের ভিসা ফি বৃদ্ধিকে অনেকেই নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন।

গোয়া পর্যটন বিভাগের কমিটির সদস্য এবং ট্রাভেল চার্টার ব্যবসায়ী আর্নেস্ট ডায়াস বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ভ্রমণে যাওয়ার প্রবণতা এখন বেড়েছে। কিন্তু জটিল ভিসা প্রক্রিয়া পর্যটকদের বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তার মতে, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড এখন গোয়ার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা, তুলনামূলক কম খরচের হোটেল এবং সস্তা প্যাকেজ বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।

ডায়াস জানান, সম্প্রতি একটি বড় রুশ চার্টার গ্রুপ গোয়া সফর বাতিল করে ভিয়েতনাম বেছে নিয়েছে। কারণ সেখানে পর্যটন চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

খরচ বৃদ্ধিও গোয়ার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় পর্যটন এবং করপোরেট অনুষ্ঠানভিত্তিক এমআইসিই খাতের সম্প্রসারণে উন্নতমানের হোটেলগুলোর ভাড়া বেড়েছে। এতে বাজেটভিত্তিক বিদেশি পর্যটকদের জন্য গোয়া আগের মতো সহজলভ্য থাকছে না।

এছাড়া সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন সাশ্রয়ী রিসোর্টের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। অনেক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম বা শ্রীলঙ্কায় একই মানের প্যাকেজ অর্ধেক খরচে পাওয়া যাচ্ছে।

লন্ডনের গ্যাটউইক থেকে গোয়ার সরাসরি এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়াও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্রিটিশ পর্যটক নিকোলা জানান, এবার তাকে বাধ্য হয়ে মুম্বাইয়ে যাত্রাবিরতি করতে হয়েছে, যা ছিল বেশ অস্বস্তিকর।

তার কথায়, “আমার ভাই এবার শ্রীলঙ্কা গেছে। তার কাছে জায়গাটি বেশি পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী মনে হয়েছে।”

পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নেও সমালোচনার মুখে পড়ছে গোয়া। সৈকত পরিষ্কার রাখতে উদ্যোগ বাড়ানো হলেও অনেক সড়ক ও আশপাশের এলাকায় ময়লার স্তূপ এখনও বড় সমস্যা।

পরিবহন ব্যবস্থাও পর্যটকদের অসন্তুষ্ট করছে। স্থানীয় ট্যাক্সি ইউনিয়নের বিরোধিতার কারণে অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি সেবা সীমিত। ফলে পর্যটকদের অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

ডায়াসের ভাষায়, “গোয়ায় এখনো সহজে অ্যাপ থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায় না। স্থানীয় ইউনিয়নগুলো বাধা দেয়।”

বিদেশি পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। বাগা সৈকতের কাছে একটি শতকক্ষের হোটেলের মালিক শারভিন লোবো জানান, তার হোটেলে বিদেশি অতিথির সংখ্যা অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে।

তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটকেরা সাধারণত দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খাওয়া, মোটরবাইক ভাড়া এবং বিভিন্ন ভ্রমণ প্যাকেজেও তারা বেশি খরচ করেন। ফলে বিদেশি পর্যটক কমে গেলে পুরো পর্যটন ব্যবস্থার ওপরই প্রভাব পড়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন নতুন কৌশল নিচ্ছে গোয়া সরকার। পর্যটক আকর্ষণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রোড শো আয়োজন করা হচ্ছে। পোল্যান্ডের পর এবার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজারেও নজর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।