প্যারিসের ২০তম অ্যারোন্ডিসমেন্টে (প্রশাসনিক এলাকা) অবস্থিত 'পের লাশেজ’ সমাধিক্ষেত্রটিতে একজন মানুষ চাইলে পুরোটা দিন কাটিয়ে দিতে পারেন।

১১০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জায়গা প্যারিস শহরের সবচেয়ে বড় সমাধিক্ষেত্র। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত বিশ্বখ্যাত মানুষদের নামের কল্যাণে এটি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিদর্শিত বা জনপ্রিয় সমাধিক্ষেত্র।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভ্রমণবিষয়ক সাময়িকী ‘ফার আউট’ লিখেছে, 'ডার্ক ট্যুরিজম' ইতিহাসের ‘অন্ধকার’ অধ্যায় ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন সবসময়ই মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

মানুষ স্বভাবগতভাবেই জীবনের অন্ধকার দিক— মৃত্যু, রহস্য এবং যেসব স্থানে এই ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়।

ব্রিটিশ গায়ক মরিসির একটি গানের ভাষায়, ‘একটি ভয়ানক রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, তাই চলো সেখানে যাই, যেখানে আমরা সুখী হব, আর তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে সমাধিক্ষেত্রের গেটে।’

মরিসি নিশ্চিতভাবেই ম্যানচেস্টারের 'সাউদার্ন সেমেট্রি' নিয়ে গানটি গেয়েছিলেন। তবে তিনি যখন কিটস এবং ইয়েটসের মতো বিভিন্ন কবি ও শিল্পীদের প্রসঙ্গ টেনে আনেন, তখন তিনি আসলে আরও বড় কিছুর ইঙ্গিত দেন।

তিনি মূলত ভক্তদের তাদের প্রিয় আইডল বা তারকাদের কবরের পাশে ফুল দেওয়া কিংবা শ্রদ্ধা জানাতে এপিটাফের ওপর একটি পাথর রেখে আসার মতো শৈল্পিক ঐতিহ্যের কথাই বলছিলেন।

একই সঙ্গে এটি এক ধরনের অদ্ভুত রোমান্টিকতাও— মৃত ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে নিজের জীবিত থাকাকে উদযাপন করা, সুন্দর পোশাকে সেজে সেখানে যাওয়া, গোপনে একটু ওয়াইন নিয়ে প্রবেশ করা এবং কবরের সারিগুলোর মাঝে একলা হেঁটে বেড়ানো।

'পের লাশেজ' এতটা জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো, এই রোমান্টিকতা যেন এর পরতে পরতে মিশে আছে। যেকোনো সাধারণ দিনেই আপনি সেখানে গেলে দেখতে পাবেন মানুষ তাদের সেরা পোশাকে সেজে এসেছে; তরুণীরা লম্বা ফুরফুরে পোশাক পরেছে, তরুণরা ভিন্টেজ স্যুট পরে মুখে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই এসেছে রক মিউজিক, শিল্প, সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্রের দুনিয়ার তাদের প্রিয় আইডলদের শ্রদ্ধা জানাতে। আর এই সব তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতির কারণেই স্থানটির আকর্ষণ দিন দিন নতুন রূপ পাচ্ছে।

কবরস্থানটি একবার ঘুরে দেখার সময় আপনি এডিথ পিয়াফ বা আন্না কারিনার মতো ফরাসি আইকনদের সালাম জানাতে পারেন; ফরাসি সাংবাদিক ভিক্টর নোয়ারের সেই বিখ্যাত সমাধি দেখতে পারেন, যা পরবর্তীতে এক অদ্ভুত উর্বরতার আচারে পরিণত হয়েছিল। আবার দার্শনিক মার্সেল প্রুস্তের কবরের সামনে বসে তার অস্তিত্ববাদী কিছু প্রশ্ন নিয়ে মনে মনে আলাপ করতে পারেন।

তবে শুধু ফরাসি তারকাদের জন্যই নয়, পের লাশেজের রয়েছে এক আন্তর্জাতিক আবেদন। রক অ্যান্ড রোল কিংবদন্তি জিম মরিসনের কবরটি সবসময়ই সংগীতপ্রেমী তীর্থযাত্রীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। প্যারিসে থাকার সময় মরিসন নিজেও প্রায়ই এই কবরস্থানে ঘুরে বেড়াতেন। আর সেই কারণেই মৃত্যুর পর তার মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে না নিয়ে এখানেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

একই গল্প অস্কার ওয়াইল্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যিনি প্যারিসে নিঃস্ব অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই লেখকের সম্মানে একটি চমৎকার এপিটাফ তৈরি করা হয়। প্যারিসের প্রতি তার ভালোবাসা এবং মৃত্যুর সঙ্গে এই শহরের যে এক ধরণের রহস্যময় ও রোমান্টিক সম্পর্ক রয়েছে, তা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

এভাবেই এই বৃত্তটি আবর্তিত হতে থাকে। সমাধিক্ষেত্রটিতে তারকাদের সমাহিত করা হয় বলেই এটি জনপ্রিয় ও শৈল্পিক সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়; আর তখনই আরও বেশি মানুষ এখানে ছুটে আসে। আর এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য শিল্পীরাও মৃত্যুর পর এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

উদীয়মান সংগীতশিল্পী লাভক্যাট তার আগামী দিনের একটি ‘মার্ডার ব্যালাড’ (খুনসংক্রান্ত লোকগীতি) নিয়ে কৌতুক করে তার ‘খুনি প্রেমিককে’ উদ্দেশ্য করে গেয়েছেন, ‘বাথটাবের পানিতে টোস্টারটি ফেলে দাও, আমার মস্তিষ্ক সেদ্ধ করো আর শরীর পুড়িয়ে দাও; শুধু আমাকে কথা দাও, পের লাশেজে আমাকে কবর দেওয়ার খরচটা তুমি দেবে।’

এই আকাঙ্ক্ষা আজও বেঁচে আছে। আর এই জনপ্রিয়তার কারণেই সমাধিক্ষেত্রটি এখন টেকনিক্যালি পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে গেছে, যেখানে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি মানুষের মরদেহ সমাহিত রয়েছে।