বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের সেবার আওতায় আনতে বড় ধরনের রূপান্তরের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। নতুন হোটেল-মোটেল নির্মাণ, স্মার্ট ট্যুরিজম ব্যবস্থা, ডিজিটাল সেবা এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের পর্যটন শিল্পকে অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন খাত ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বর্তমানে দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র উপকূল, পাহাড়, নদী ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সমন্বয়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা অনেক বড়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এখন পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। বিশেষ করে ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকাগুলোকে আধুনিক সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি নতুন হোটেল ও মোটেলে সেবা কার্যক্রমও চালু হয়েছে।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ ও হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব। সেখানে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সাততলা বিশিষ্ট আধুনিক ‘পর্যটন মোটেল ও ইয়ুথ ইন’। একই ভবনে রয়েছে আধুনিক স্যুট রুম, পরিবারবান্ধব আবাসন এবং স্বল্প ব্যয়ের ডরমিটরি সুবিধা। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দিনাজপুরেও ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক মোটেল। অন্যদিকে মেহেরপুরের মুজিবনগরে ডিজিটাল সেবাসমৃদ্ধ পর্যটন মোটেল নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনে আরও আগ্রহী হবে।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু ঘিরেও নেওয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতি বর্ষায় কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়লে সেতু তলিয়ে যাওয়ার পুরোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন নকশা তৈরির উদ্যোগ চলছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি এবং টেকসই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিশ্চিত করতে প্রবেশমূল্য সামান্য বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কক্সবাজার অঞ্চলে সাবরাং ও নাফ ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণকাজও এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্মার্ট ট্যুরিজমে জোর
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘স্মার্ট ট্যুরিজম’ ইকোসিস্টেম। পর্যটন করপোরেশন এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জাতীয় ড্যাশবোর্ড, স্মার্ট গাইড অ্যাপ এবং আরএফআইডি ট্যাগ প্রযুক্তি চালুর কাজ করছে।
বিশেষ করে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন এলাকা সেন্ট মার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণে ই-টিকিটিং ও অনলাইন বুকিং বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ দ্রুত এগোচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটন পরিবহনে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যান যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা পর্যটন করপোরেশনের হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোকে লাভজনক করতে পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহ্য রক্ষা করে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
পর্যটনে বিনিয়োগে নতুন আস্থা
কক্সবাজারে বিশ্বমানের আতিথেয়তা শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ‘ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার’। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. তারিক মাহমুদ বলেন, শুধু আবাসন নয়, পরিবারবান্ধব ও নিরাপদ পর্যটন অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে রিসোর্টটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে অভিজ্ঞ চীনা প্রতিষ্ঠান। আধুনিক নির্মাণশৈলী, নিরাপত্তা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগযোগ্য পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তারিক মাহমুদ আরও বলেন, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে আতিথেয়তা খাতে স্বচ্ছতা ও আস্থা তৈরি করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় কুয়াকাটায় ‘ছুটি ভিলা’ প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে।
হোটেল খাতে ব্যয় সাশ্রয়ের নতুন কৌশল
আতিথেয়তা শিল্পে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অপচয় রোধকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘সিক্স কন্ট্রোল পয়েন্ট’ মডেল অনুসরণ করে দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা, শেরাটন ঢাকা ও হ্যান্সা বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা সাশ্রয় করছে।
এই ব্যবস্থায় ক্রয় নিয়ন্ত্রণ, ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা, সঠিক স্থানান্তর, পোরশন নিয়ন্ত্রণ, সঠিক রান্না ও অপচয় রোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতি এবং সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, ব্যয় কমানো মানেই নিম্নমানের সেবা নয়। বরং মেনু পরিকল্পনা, স্থানীয় পণ্যের ব্যবহার এবং কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে আতিথেয়তা শিল্পকে আরও লাভজনক ও টেকসই করা সম্ভব।