মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান। বহু শতাব্দী ধরে কবি, সাহিত্যিক ও ভ্রমণপিপাসুদের কল্পনায় এক রহস্যময় নাম। বিশেষ করে সামারকান্দ, যে শহরকে ঘিরে ইংরেজ কবিদের অসংখ্য কবিতা, কাহিনি ও রোমান্টিক কল্পনা জন্ম নিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপিনডেন্ট লিখেছে, রূপকথার মতো নীল গম্বুজ, বিশাল মাদ্রাসা আর সিল্ক রোডের ইতিহাসে ভরপুর এই দেশ এখন ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠছে।

একসময় চেঙ্গিস খান, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও সম্রাট তিমুরের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল উজবেকিস্তান। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি। বর্তমানে সেই অতীত ঝেড়ে নতুন রূপে বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে উঠে আসছে উজবেকিস্তান।

নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গন্তব্য 
পর্যটকদের কাছে উজবেকিস্তানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, এটি নিরাপদ, বন্ধুসুলভ এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী। দেশটির মুদ্রা সোমের কারণে বিদেশি পর্যটকরা এখানে গিয়ে সহজেই ‘কোটিপতি’ হয়ে যান। কারণ বাংলাদেশের ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় প্রায় এক লাখ সোম। ইউরোপের তুলনায় হোটেল, খাবার ও কেনাকাটার খরচও অনেক কম।

রাজধানী তাশখন্দ এখন আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মিশেলে গড়ে ওঠা এক প্রাণবন্ত শহর। প্রশস্ত সড়ক, গাছঘেরা অ্যাভিনিউ, বিলাসবহুল হোটেল, আধুনিক শপিংমল এবং সোভিয়েত স্থাপত্যের সঙ্গে নতুন কাচ-ইস্পাতের ভবন শহরটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

সিল্ক রোডের রঙিন ঐতিহ্য 
উজবেকিস্তানকে বলা হয় ‘আলাদিনের গুহা’, যেখানে রেশমি পোশাক, হাতে তৈরি কার্পেট, সূচিশিল্প, গয়না ও ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের সমাহার। বিশেষ করে বুখারা অঞ্চলের সিল্ক কার্পেট ও তাশখন্দের সুজানি এমব্রয়ডারি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
উজবেক ডিজাইনার মাদিনা কাসিমবায়েভাকে অনেকে ‘মধ্য এশিয়ার প্রাডা’ বলেও ডাকেন। তার তৈরি সুজানি এমব্রয়ডারি কোট এখন ইউরোপ ও আমেরিকার ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছেও সমাদৃত। সম্প্রতি মিলান ফ্যাশন উইকেও উজবেক নকশা ও কাপড় বিশেষভাবে নজর কাড়ে।

সামারকান্দ: নীল গম্বুজের শহর
সামারকান্দের প্রাণকেন্দ্র রেগিস্তান, যেখানে তিনটি বিশাল মাদ্রাসা নীল ও সোনালি টাইলসের কারুকাজে ঝলমল করে। কাছেই রয়েছে শাহ-ই-জিন্দা নেক্রোপলিস, যেখানে সরু পথের দুই পাশে সাজানো রয়েছে অলংকৃত সমাধি।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো গুর-ই-আমির; সম্রাট তিমুরের সমাধিসৌধ। এর নীল গম্বুজ ও স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীতে ভারতের তাজমহল নির্মাণেও প্রভাব ফেলেছিল বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।

বুখারা ও খিভা—জীবন্ত ইতিহাস
বুখারা শহরের পুরোনো অংশে ঢুকলেই মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে। সরু গলি, প্রাচীন বাজার, কারুশিল্পের দোকান আর শত শত বছরের পুরোনো স্থাপনা শহরটিকে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক আবহ। এখানকার পোই কল্যাণ কমপ্লেক্স এবং ক্যালিয়ান মিনার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভ্রমণকারীদের পথ দেখিয়ে আসছে।
Box অন্যদিকে খিভা যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর। প্রাচীরঘেরা ইচান কালা এলাকায় রয়েছে অসংখ্য মসজিদ, প্রাসাদ ও মাদ্রাসা। এখানকার অসমাপ্ত ফিরোজা রঙের কালতা মাইনর মিনারেট মিনার শহরের অন্যতম প্রতীক।

আতিথেয়তা ও খাবারে মুগ্ধ পর্যটকরা
উজবেকিস্তানের আতিথেয়তা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। স্থানীয়রা অতিথিদের সামনে টেবিলভর্তি খাবার পরিবেশন করতে ভালোবাসেন। দেশটির জনপ্রিয় খাবার ‘প্লভ’, যা ভাত, গাজর ও মাংস দিয়ে তৈরি এক ঐতিহ্যবাহী পদ। এছাড়া ‘নন’ নামে পরিচিত গোল রুটি, সামসা, ডালিমের জুস ও গ্রিন টি প্রায় সব জায়গাতেই পাওয়া যায়।
স্থানীয় সংস্কৃতিতে ‘নন’ রুটিকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। মাটির চুলায় তৈরি এই রুটি উল্টো করে রাখা বা ফেলে দেওয়া অশোভন বলে ধরা হয়।

আধুনিক সংস্কৃতি ও শিল্পের উত্থান
উজবেকিস্তান এখন শুধু ইতিহাসের দেশ নয়, সমকালীন শিল্প-সংস্কৃতিরও কেন্দ্র হয়ে উঠছে। রাজধানীতে নতুন কনসার্ট হল, সমকালীন শিল্পগ্যালারি এবং আন্তর্জাতিক মানের জাদুঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
দেশটির সাংস্কৃতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন গায়ানে উমরোভা। তার উদ্যোগে ফরাসি ডিজাইন স্টুডিওর সহায়তায় নতুন আর্ট গ্যালারি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জাপানি স্থপতি তাদাও আন্দো-এর নকশায় নির্মিত হচ্ছে নতুন জাতীয় জাদুঘর।

ইতিহাস, শিল্প ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
সামারকান্দ, বুখারা ও খিভা—এই তিন শহরের ভ্রমণ যেন সিল্ক রোডের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রা। কোথাও রাজকীয় মহিমা, কোথাও জীবন্ত পুরোনো শহর, আবার কোথাও সময়ের মধ্যে আটকে থাকা ঐতিহ্য।
বিশাল ফিরোজা গম্বুজ, নীল টাইলসের মোজাইক, সিল্ক রোডের গল্প আর আন্তরিক আতিথেয়তা— সব মিলিয়ে উজবেকিস্তান এখন আধুনিক ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এক নতুন স্বপ্নের গন্তব্য হয়ে উঠছে।