পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডা। দেশটিতে ‘রোলেক্স’ বললে কারো চোখে বিলাসবহুল ঘড়ির কথা ভেসে ওঠে না। বরং রোলেক্স মানে সেখানকার মানুষ বোঝে, ডিম ও চাপাটি দিয়ে তৈরি এক জনপ্রিয় স্ট্রিটফুড, যা এখন দেশটির জাতীয় খাবারের মর্যাদা পেয়েছে।
উগান্ডার উদ্যোক্তা ইমানুয়েল জোনাথন ওকেলো যখন নিজের রেস্তোরাঁ চালুর পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন, মেনুর প্রধান আকর্ষণ হবে ‘রোলেক্স’। তার ভাষায়, ‘উগান্ডায় আমরা রোলেক্স পরি না, খাই।’
কীভাবে এলো ‘রোলেক্স’ নাম?
সিএনএন ট্রাভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই খাবারের নাম এসেছে ‘রোলড এগস’ থেকে। মূলত ভারতীয় চাপাটির ভেতরে অমলেট ভরে রোল করে পরিবেশন করা হতো বলে স্থানীয়রা একে ‘রোলেক্স’ বলতে শুরু করেন।
উগান্ডায় চাপাটির আগমন ঘটে ব্রিটিশ আমলে, যখন ভারতীয় শ্রমিকদের রেলপথ নির্মাণে সেখানে নেওয়া হয়েছিল।
ভারতীয় খাবার ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে কেনিয়া সীমান্তবর্তী বাসোগা অঞ্চলে। পরে উগান্ডাবাসী নিজেদের স্বাদ অনুযায়ী চাপাটিকে আরও নরম ও মুচমুচে করে তৈরি করতে শুরু করে।
শ্রমিকের খাবার থেকে জাতীয় পরিচয়
শুরুর দিকে এটি ছিল পূর্ব উগান্ডার শ্রমজীবী মানুষের সস্তা খাবার। কিন্তু ধীরে ধীরে রোলেক্স ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। বর্তমানে এটি রাস্তার দোকান থেকে শুরু করে আধুনিক ক্যাফে, এমনকি অভিজাত রুফটপ রেস্তোরাঁর মেনুতেও জায়গা করে নিয়েছে।
খাবারটি ১৯৯০ এর দশকে রাজধানী কাম্পালার মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মাত্র ২০ সেন্টের মধ্যে পেট ভরে যেত বলে ছাত্রদের কাছে এটি ছিল আদর্শ খাবার।
কী থাকে রোলেক্সে?
প্রচলিত রোলেক্সে পাতলা অমলেটের সঙ্গে চাপাটির ভেতরে বাঁধাকপি ও টমেটো যোগ করা হয়। এরপর পুরোটা রোল করে পরিবেশন করা হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উপকরণেও এসেছে বৈচিত্র্য। উদ্যোক্তা ওকেলো একবার জিনজা শহরে গিয়ে এমন এক বিক্রেতার দেখা পান, যিনি রোলেক্সে গরুর ভুঁড়ি ব্যবহার করতেন। সেই অভিজ্ঞতার পর তিনি বুঝতে পারেন, রোলেক্সে প্রায় যেকোনো উপাদানই ব্যবহার করা সম্ভব।
এরপর তিনি তৈরি করেন নানা ধরনের রোলেক্স—বিফ সসেজ, চিকেন গ্রেভি, কারি, বেকন, অ্যাভোকাডো, কিমা মাংসসহ অসংখ্য সংমিশ্রণ। এমনকি একসময় ফল দিয়েও রোলেক্স তৈরির চেষ্টা হয়েছিল, যদিও সেটি খুব জনপ্রিয় হয়নি।
রোলেক্স নিয়ে বই ও উৎসব
উগান্ডায় এখন প্রতিবছর ‘রোলেক্স ফুড ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজন করা হয়। এছাড়া লেখক জোনাথন কাবুগো ‘হাউ টু রোলেক্স’ নামে একটি রান্নার বইও লিখেছেন, যেখানে এই খাবারের নানা নতুন রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
তার মতে, রোলেক্স উগান্ডার খাবারের সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে দেশটির অধিকাংশ খাবার আলাদা আলাদা তরকারি ও শর্করাজাতীয় খাবার দিয়ে পরিবেশন করা হতো। কিন্তু রোলেক্স সবকিছু সহজ করে একসঙ্গে হাতে ধরে খাওয়ার মতো খাবারে রূপ দিয়েছে।
আফ্রিকা ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তা
বর্তমানে কেনিয়া, রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডিতেও রোলেক্স পাওয়া যায়। তবে উগান্ডাতেই এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং দেশটির অনানুষ্ঠানিক জাতীয় খাবার হিসেবে বিবেচিত।
ফাথি রেইনার্জ নামের এক আফ্রিকান শেফ বলেন, “উগান্ডার খাবারের পরিচয় বলতে রোলেক্সের চেয়ে বড় কিছু নেই। ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় যেমন পিৎজা ছাড়া কল্পনা করা যায় না, তেমনি এই অঞ্চলের খাবারে রোলেক্স না থাকলে তা অসম্পূর্ণ।”
রোলেক্স নামটি বিলাসবহুল ঘড়ির ব্র্যান্ডের সঙ্গে মিলে গেলেও উগান্ডাবাসীর কাছে এর অর্থ একটাই— সুস্বাদু এক স্ট্রিটফুড।