২০২৫ সালে পর্যটন খাতে রেকর্ড আয় করেছে সিঙ্গাপুর। আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক আয়োজন বৃদ্ধির ফলে দেশটির পর্যটন আয় পৌঁছেছে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আগামী পাঁচ বছরে পর্যটন উন্নয়ন তহবিলে আরও ৭৪০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর নগররাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। আধুনিক স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, বৈচিত্র্যময় খাবার সংস্কৃতি, পরিবারবান্ধব বিনোদন ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশটিকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

গত ৮ মে আয়োজিত পর্যটন শিল্প সম্মেলনে সিঙ্গাপুরের টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশমন্ত্রী গ্রেস ফু জানান, ২০২৫ সালে দেশটিতে ১ কোটি ৬৯ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। তাদের ব্যয় থেকেই পর্যটন আয় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এই আয় সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ডের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। সংস্থাটি আগে ২৯ থেকে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার আয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এমনকি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত সম্ভাব্য আয়ের সীমাও ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে ২০২৫ সালের আয়।

গ্রেস ফু বলেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, প্রদর্শনী, করপোরেট সভা ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনের কারণে পর্যটন খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এসেছে। বিশেষ করে মিটিং, ইনসেনটিভ, কনফারেন্স ও এক্সিবিশন বা মাইস খাত বড় ভূমিকা রেখেছে।

সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী মেলিসা ওউ জানান, ২০২৪ সালের ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার থেকে ২০২৫ সালে মাইস পর্যটন আয় বেড়ে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি।

‘ট্যুরিজম ২০৪০’ পরিকল্পনার আওতায় ২০৪০ সালের মধ্যে মাইস খাতের আয় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।

তবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মাঝেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন গ্রেস ফু। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ এবং বৈশ্বিক ভোক্তা ব্যয়ের অনিশ্চয়তা আগামী সময়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তার পরও সিঙ্গাপুর সরকার মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে।

পর্যটনে বাড়ছে সরকারি বিনিয়োগ

পর্যটন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে পর্যটন উন্নয়ন তহবিলে ৭৪০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার যুক্ত করা হবে। এই অর্থ বিভিন্ন অবকাঠামো, বিপণন, দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন পণ্য তৈরির প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।

এর আগে ২০২৪ সালে এ খাতে অতিরিক্ত ৩০০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

সরকার ‘বিজনেস ইভেন্টস ইন সিঙ্গাপুর গ্রান্ট’-এর জন্য ৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বরাদ্দ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আয়োজন বাড়াতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা হবে।

নতুন ‘মার্কেট অ্যাক্সেস ফান্ড’-এর আওতায় আরও ৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার দেওয়া হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজারে প্রবেশের ঝুঁকি কমাতে পারে।

এ ছাড়া ‘হোটেল রিজুভেনেশন ফান্ড’-এর মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৩টি হোটেল সংস্কার ও আধুনিকায়নে সহায়তা পেয়েছে।

পর্যটন খাতে নতুন ধারণা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর জন্য ‘কিকস্টার্ট ফান্ড’-এর সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে একটি প্রকল্প সর্বোচ্চ ১ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত সহায়তা পাবে।

নতুন মাইস হাব ও ক্রুজ টার্মিনালের পরিকল্পনা

সিঙ্গাপুর সরকার স্ট্রেইটস ভিউ এলাকায় নতুন সমন্বিত ক্রুজ ও ফেরি টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে তিনটি ক্রুজ বার্থ ও সর্বোচ্চ ১০টি ফেরি বার্থ থাকবে।

সরকারের মতে, এটি চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা বর্তমান মেরিনা বে ক্রুজ সেন্টারের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ এবং হারবারফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের দ্বিগুণ হবে।

একই এলাকায় নতুন ডাউনটাউন মাইস হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে আরও বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও ব্যবসায়িক আয়োজন সিঙ্গাপুরে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন এই হাবের পাশে থাকবে থার্মে সিঙ্গাপুর ওয়েলনেস প্রকল্প ও ‘ওয়েটল্যান্ডস বাই দ্য বে’ সম্প্রসারণ এলাকা।

সেন্টোসা ও অর্চার্ড রোডে বড় উন্নয়ন

সিঙ্গাপুরের পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম বড় অংশ হলো ‘গ্রেটার সেন্টোসা মাস্টার প্ল্যান’। আগামী দুই দশকে সেন্টোসা ও পুলাউ ব্রানিকে বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্যে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

১২০ হেক্টর আয়তনের পুলাউ ব্রানিতে নতুন হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা হবে। সরকারের আশা, এই উন্নয়ন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যটক আকর্ষণ করবে।

এ ছাড়া অর্চার্ড রোডের পুনর্উন্নয়ন কাজও চলমান রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটনে জোর

পর্যটন খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তি ব্যবহারে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সিঙ্গাপুর। ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল ও মাইস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন ডিজিটাল সহায়তা পরিকল্পনা চালু করা হচ্ছে।

সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ড পর্যটন প্রযুক্তি রূপান্তরের জন্য একটি ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ গড়ে তুলছে। পাশাপাশি পর্যটন খাতের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি প্লেবুকও চালু করা হবে।

সামনে ধীরগতির শঙ্কা

মেলিসা ওউ বলেন, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে পর্যটক আগমন স্থিতিশীল থাকলেও আগামী মাসগুলোতে চাহিদা কিছুটা কমতে পারে।

তবে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কিছু ফ্লাইট বাতিল বা রুট পরিবর্তন হলেও সিঙ্গাপুর বিমান চলাচল সক্ষমতায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশা করছে। অনেক এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরের আকাশপথে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।