চীনের পাহাড়ি ঢালে জন্ম নেওয়া এক ধরনের সবুজ চা এখন বিলাসী পানীয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নাম তার ‘লংজিং’ বা ‘ড্রাগন ওয়েল’ চা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই চা চীনের অভিজাত সংস্কৃতি, রাজপরিবার এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বর্তমানে এর কিছু বিশেষ মানের চা-পাতার দাম এতটাই বেড়েছে যে প্রতি কেজির মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ লাখ টাকারও বেশি দাঁড়ায়।
বিবিসি লিখেছে, চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝৌ শহরের ওয়েস্ট লেক ঘিরে থাকা পাহাড়ি অঞ্চলে মূলত এই চায়ের চাষ হয়।
বসন্তের শুরুতেই শুরু হয় সবচেয়ে মূল্যবান পাতা সংগ্রহের মৌসুম। স্থানীয় কৃষক গে শিয়াওপেং বলেন, বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহের একটি সময়কে ধরা হয় সেরা ফসল তোলার মৌসুম হিসেবে।
এই সময়ের চা-পাতাকে বলা হয় ‘মিংচিয়ান’ লংজিং। চীনা সৌর পঞ্জিকার ‘চিংমিং’ মৌসুম শুরুর আগেই এই পাতা সংগ্রহ করা হয়। সবচেয়ে কোমল ও সুগন্ধি হওয়ায় এই পাতার মূল্য আকাশছোঁয়া। গে পরিবারের খামারে মাত্র ৫০০ গ্রাম মিংচিয়ান লংজিংয়ের দাম ৩০ হাজার ইউয়ান পর্যন্ত উঠেছে। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৫ লাখ টাকার সমান। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম ১০ লাখ টাকারও বেশি।
চা-চাষিদের মতে, জলবায়ু, আবহাওয়া এবং সংগ্রহের সময়—সবকিছুই এই চায়ের স্বাদ নির্ধারণ করে। হালকা কুয়াশা, মৃদু রোদ ও ধীরগতির বৃদ্ধি পাতাকে করে তোলে কোমল ও মিষ্টি স্বাদের। কয়েক দিনের ব্যবধানেও স্বাদে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এপ্রিলের শেষদিকে তাপমাত্রা বাড়লে পাতায় তিক্ততা চলে আসে, ফলে দামও কমে যায়।
লংজিং চায়ের বিশেষত্ব শুধু চাষে নয়, এর প্রস্তুত প্রণালীতেও। পাতা সংগ্রহের পর বিশাল লোহার কড়াইয়ে প্রায় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে হাতে হাতে ভাজা হয় চা-পাতা। অভিজ্ঞ কারিগররা খালি হাতেই গরম কড়াইয়ে পাতা নেড়ে দেন। এতে পাতার আর্দ্রতা কমে, সবুজ রং অক্ষুণ্ন থাকে এবং তৈরি হয় লংজিংয়ের বিখ্যাত বর্শার মতো আকৃতি।
চাষি গে ঝেংহুয়া বলেন, মেশিনে একই কাজ করা গেলেও হাতে ভাজার স্বাদ আলাদা। তার ভাষায়, “মানুষের হাত যেটা বুঝতে পারে, মেশিন সেটা পারে না।” তবে শ্রমসাধ্য হওয়ায় এখন অনেক কৃষক মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
লংজিং চায়ের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেড়েছে। চীনের তরুণ প্রজন্ম আবার ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও আঞ্চলিক চীনা চায়ের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বাজারে নকল লংজিংয়ের বিস্তারও ঘটেছে।
চীনা সরকার আসল ওয়েস্ট লেক লংজিং চায়ের জন্য নির্দিষ্ট ১৬৮ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল নির্ধারণ করেছে। এই অঞ্চলের বাইরের চা আইনগতভাবে ‘ওয়েস্ট লেক লংজিং’ নামে বিক্রি করা যায় না। আসল চা শনাক্ত করতে এখন প্রত্যয়ন স্টিকার ও কিউআর কোড ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
চা বিশেষজ্ঞদের মতে, লংজিংয়ের আসল সৌন্দর্য এর সূক্ষ্ম স্বাদে। এটি তীব্র নয়, বরং ধীরে ধীরে মুখে মিষ্টি ও বাদামি সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয়। অনেকেই এর সুবাসকে বসন্তের ফুলের সঙ্গে তুলনা করেন।
একসময় আশঙ্কা ছিল, নতুন প্রজন্ম শহরমুখী হয়ে পড়ায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। তবে এখন আবার তরুণরা পারিবারিক খামারে ফিরছেন। কারণ, লংজিং চা শুধু লাভজনক পেশাই নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
হাংঝৌর পাহাড়ি চা-বাগানগুলো তাই এখন শুধু চা উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং চীনের ঐতিহ্য, শ্রম ও স্বাদের এক জীবন্ত প্রতীক।