১৮৪ দেশ ঘুরে ইতিহাস গড়লেন নাজমুন নাহার। বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে এই অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তার এই অভিযাত্রা এখন বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক।
বাংলাদেশের ভ্রমণ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করলেন পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। বিশ্বের ১৮৪টি দেশ ভ্রমণ করে তিনি গড়েছেন অনন্য বিশ্বরেকর্ড। প্রথম বাংলাদেশি এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ বাহামা সফরের মাধ্যমে তার এই দীর্ঘ যাত্রা পূর্ণতা পায়। বাহামা ছিল তার ভ্রমণ তালিকার ১৮৪তম দেশ।
নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালে। ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই পথচলা ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে নানা প্রতিকূলতা, সীমান্ত জটিলতা, আর্থিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত বাধা অতিক্রম করে তিনি এই মাইলফলকে পৌঁছান।
তার ভ্রমণ অভিযাত্রার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধাপ হলো:
১ জুন ২০১৮ সালে জাম্বিয়া-জিম্বাবুয়ে সীমান্তে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায় দাঁড়িয়ে ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
৬ অক্টোবর ২০২১ সালে আফ্রিকার দেশ সাওটোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপ সফরের মাধ্যমে পূর্ণ হয় ১৫০তম দেশ ভ্রমণ।
২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি ১৭৫তম দেশ ভ্রমণ সম্পন্ন করেন।
সবশেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে পূর্ণ হয় ১৮৪ দেশের রেকর্ড।
এই অর্জনের সময় বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস ব্যক্তিগতভাবে নাজমুন নাহারকে অভিনন্দন জানান। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার এই সাফল্য ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নাজমুন নাহার শুধু ভ্রমণ করেননি, প্রতিটি দেশে পৌঁছে দিয়েছেন মানবিক বার্তা। তার প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল, ‘নো ওয়ার, ওনলি পিস। সেভ দ্য প্ল্যানেট। স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ।’
বিশ্বশান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বার্তা নিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন। তার এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে ভূমিকা রেখেছে।
অধিকাংশ দেশ তিনি সড়কপথে একাই ভ্রমণ করেছেন। একজন ‘সোলো ট্রাভেলার’ হিসেবে তাকে বহুবার জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়েছে।
সাম্প্রতিক ভেনিজুয়েলা সফর প্রসঙ্গে নাজমুন নাহার বলেন, ভেনিজুয়েলা ভ্রমণ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সীমান্তে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে তাকে ১৭টি শহর ঘুরতে হয়েছে। তবে আন্দিজ পর্বতমালার সৌন্দর্য এবং নীল সমুদ্রের দৃশ্য সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষ ধাপের অভিযাত্রায় তিনি সামোয়া, তিমুর লেস্তে, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস এবং ভেনিজুয়েলা সফর করেন।
লক্ষ্মীপুরের এই কৃতি সন্তান শিক্ষাজীবনেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০৬ সালে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে মানবাধিকার বিষয়ে ডিগ্রি নেন।
পেশায় গবেষক ও মোটিভেশনাল স্পিকার নাজমুন নাহার তার মাকেও সঙ্গে নিয়ে ১৪টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার বাবা, দাদা এবং বই ছিল তার ভ্রমণজীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
বিশ্বজুড়ে তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এখন পর্যন্ত ৬০টির বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন নাজমুন নাহার।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন তিনি। নেলসন ম্যান্ডেলা ও মাদার তেরেসার মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বও এই সম্মাননা পেয়েছিলেন।
এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন পিস রানার অ্যাওয়ার্ড, অনন্যা শীর্ষ দশ, উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, আতিশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল এবং গেম চেঞ্জার অব বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ডসহ আরও বহু সম্মাননা।
নাজমুন নাহারের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি বাংলাদেশের জন্যও গর্বের এক অধ্যায়। সাহস, ধৈর্য ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, তার যাত্রা যেন সেই বার্তাই নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে।