দীর্ঘদিন ধরে উদার ভিসা নীতির জন্য পরিচিত থাইল্যান্ড এবার সেই নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। বিদেশি নাগরিকদের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা, অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ এবং স্থানীয়দের বাড়তে থাকা ক্ষোভের মুখে ৯৩ দেশের পর্যটকদের জন্য ভিসা-মুক্ত অবস্থানের মেয়াদ ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিনে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে দেশটি।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকাও মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই মন্ত্রিসভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। শুধু ভিসা-মুক্ত প্রবেশ সুবিধাই নয়, একই সঙ্গে বিনিয়োগ ভিসা, দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অনুমতি, শিক্ষার্থী ভিসা এবং ডিজিটাল নোম্যাড কর্মসূচির যোগ্যতার বিষয়গুলোও পুনর্বিবেচনা করা হবে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালে দেশটিতে প্রায় ৪ কোটি বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও পর্যটক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে অনেকে থাইল্যান্ডে দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থান শুরু করেন।
তবে এই প্রবণতার ফলে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোতে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক বিদেশি বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের নাগরিকরা থাই নাগরিকদের নামে কোম্পানি নিবন্ধন করে স্থানীয় আইন ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি উঠেছে।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, সরকার পুরোপুরি ভিসা-মুক্ত নীতি বাতিল করতে চায় না। কারণ পর্যটন এখনও দেশের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, “ভিসা-মুক্ত প্রবেশ মানে শর্তহীন প্রবেশ নয়। আমাদের ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় দ্বীপ কো ফাঙ্গান সফর করবেন বলে জানা গেছে। দ্বীপটি মাসিক ‘ফুল মুন পার্টি’, সাদা বালুর সৈকত ও রাতের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেখানে বিদেশিদের পরিচালিত অবৈধ ব্যবসা এবং পর্যটন ও শ্রম আইন বাস্তবায়নের বিষয় তদারকি করবেন তিনি।
এর আগে ফুকেত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছিলেন, সমুদ্রসৈকতে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানো কিংবা স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানো বিদেশি “গুন্ডাদের” কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকারের মুখপাত্র রাচাদা ধনাদিরেক জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনকে সারাদেশে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে থাই নাগরিকদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে সম্প্রতি পাতায়া শহরে এক চীনা নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনায়। পুলিশ দাবি করেছে, তার কাছ থেকে সামরিক মানের আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, গ্রেনেড এবং রুশ ল্যান্ডমাইন উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে তার ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এছাড়া ফুকেটসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অবৈধভাবে বার, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে বহু বিদেশির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। সম্প্রতি ফুকেটে ৩৩ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের মধ্যে ১৩ জন রুশ এবং ১২ জন চীনা নাগরিক।
তবে কঠোর ভিসা নীতি থাইল্যান্ডের জন্য নতুন এক দ্বিধাও তৈরি করেছে। গত বছর প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ বিদেশি পর্যটকের কাছ থেকে দেশটি প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার আয় করেছে। তাই একদিকে অবৈধ কার্যক্রম দমন, অন্যদিকে পর্যটন খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ব্যাংককের বড় চ্যালেঞ্জ।
থাইল্যান্ডের পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম চালু হলে পর্যটকরা বিকল্প গন্তব্য হিসেবে ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
৯৩ দেশের তালিকায় কারা
অ্যান্ডোরা, আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বাহরাইন, বেলজিয়াম, ভুটান, ব্রাজিল, ব্রুনেই, বুলগেরিয়া, কম্বোডিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কলম্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কিউবা, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ডোমিনিকা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ইকুয়েডর, এস্তোনিয়া, ফিজি, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জর্জিয়া, জার্মানি, গ্রিস, গুয়াতেমালা, হংকং, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েল, ইতালি, জ্যামাইকা, জাপান, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, লাওস, লাটভিয়া, লিচেনস্টেইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, ম্যাকাও, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাল্টা, মরিশাস, মেক্সিকো, মোনাকো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ওমান, পানামা, পাপুয়া নিউগিনি, পেরু, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, কাতার, রোমানিয়া, রাশিয়া, সান মারিনো, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, শ্রীলংকা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তুরস্ক, ইউক্রেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম।