একসময় ভ্রমণ ছিল সীমিত মানুষের শখ। পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে বছরে এক-দুইবার কোথাও ঘুরতে যাওয়াই ছিল বড় আনন্দ। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন দেশের লাখো তরুণ-তরুণী যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন ভ্রমণভিত্তিক অনলাইন কমিউনিটি ও ট্রাভেলার্স গ্রুপে। এসব গ্রুপ শুধু ভ্রমণের পরিকল্পনাই করে না, তৈরি করছে নতুন বন্ধুত্ব, নতুন অভিজ্ঞতা এবং এক নতুন জীবনধারা।

বর্তমানে বাংলাদেশে শতাধিক সক্রিয় ভ্রমণ কমিউনিটি থাকলেও কয়েকটি সংগঠন বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সদস্যসংখ্যা, ভ্রমণ আয়োজন এবং সামাজিক প্রভাবের কারণে।

নারীদের নিরাপদ ভ্রমণকে জনপ্রিয় করে তুলতে সবচেয়ে আলোচিত সংগঠনগুলোর একটি হলো “ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ” (Travelettes of Bangladesh)। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের কমিউনিটিতে রয়েছে প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি নারী সদস্য। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নারী ভ্রমণ নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।

অন্যদিকে “ট্রাভেলার্স ইন বাংলাদেশ” (Travelers in Bangladesh) দেশের অন্যতম বড় ও পুরোনো ভ্রমণ কমিউনিটি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা নিয়মিত দলভিত্তিক ট্যুর, অ্যাডভেঞ্চার ট্রিপ এবং দেশীয় পর্যটন প্রচারে কাজ করে যাচ্ছে।

নারী ভ্রমণকারীদের আরেকটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হলো “ওয়ান্ডার ওম্যান” (Wander Woman)। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই কমিউনিটি এখন হাজারো নারী ভ্রমণকারীর আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। অনেক নারী প্রথমবারের মতো একক কিংবা দলীয় ভ্রমণের সাহস পাচ্ছেন এই ধরনের কমিউনিটির মাধ্যমে।

অ্যাডভেঞ্চার ও পাহাড়ি ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে “ট্যুরদেশ” (TourDesh)। পাহাড়, ঝর্ণা, ট্রেকিং ও প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ভিন্নধর্মী ভ্রমণ সংস্কৃতি তৈরি করছে এই প্ল্যাটফর্ম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এসব ভ্রমণ কমিউনিটি দেশের পর্যটন শিল্পে বড় ভূমিকা রাখছে। সাজেক, বান্দরবান, সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার, সিলেট কিংবা সুন্দরবনের মতো পর্যটন এলাকাগুলোতে এখন প্রায় সারা বছরই ভ্রমণকারীদের উপস্থিতি দেখা যায়। এর ফলে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বাড়ছে কিছু ঝুঁকিও। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অনভিজ্ঞ কিংবা ভুয়া আয়োজক পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই ট্যুর পরিচালনা করছে। ফলে নতুন ভ্রমণকারীদের যাচাই-বাছাই করে বিশ্বস্ত গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অভিজ্ঞরা।

তরুণদের কাছে এখন ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, বরং মানসিক প্রশান্তি, নতুন মানুষ চেনা এবং জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি মাধ্যম। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের এই বৃহৎ ভ্রমণ কমিউনিটিগুলো।

সবশেষে বাংলাদেশের ভ্রমণ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে আরও অসংখ্য জনপ্রিয় ট্রাভেল কমিউনিটি ও গ্রুপ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ ট্রাভেলার্স কমিউনিটি”, “ভ্রমণ বাংলাদেশ”, “ভ্রমণপিপাসু বাংলাদেশ”, “ব্যাকপ্যাকার্স অব বাংলাদেশ”, “ট্রাভেলার্স ডায়েরি বাংলাদেশ”, “ট্যুর গ্রুপ বিডি”, “বাংলার পথিক”, “ঘুরে আসি”, “চলো ঘুরি বাংলাদেশ”, “দেশ ভ্রমণ”, “ট্রাভেল বাংলাদেশ”, “অ্যাডভেঞ্চার লাভার্স বাংলাদেশ”, “হাইকিং বাংলাদেশ”, “ক্যাম্পার্স বাংলাদেশ”, “ট্রেকার্স অব বাংলাদেশ”, “ঘুরন্তে”, “বাংলাদেশ রোড ট্রিপার্স”, “ট্রাভেল ফ্রিকস বাংলাদেশ”, “ভ্রমণ বিলাস”, “ট্যুরিজম লাভার্স বাংলাদেশ”, “ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ”, “ভ্রমণ ক্লাব বাংলাদেশ”, “ট্রাভেল বাগ বাংলাদেশ”, “ট্রাভেলহোলিক বাংলাদেশ”, “চলো পালাই”, “উইকেন্ড ট্রাভেলার্স”, “সাজেক লাভার্স”, “বান্দরবান এক্সপ্লোরার্স”, “সেন্টমার্টিন ট্রাভেলার্স”, “সিলেটিয়ান ট্রাভেলার্স”, “সুন্দরবন এক্সপেডিশন”, “কক্সবাজারিয়ান ট্রাভেলার্স”, “বাংলাদেশ নেচার লাভার্স”, “মাউন্টেন লাভার্স বাংলাদেশ”, “ট্রাভেল ফটোগ্রাফার্স বাংলাদেশ”, “নোম্যাড বাংলাদেশ”, “ঘুরাঘুরি বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ ট্যুরার্স”, “এক্সপ্লোর বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ ক্যাম্পিং কমিউনিটি”, “ট্রাভেল সোসাইটি বাংলাদেশ”, “অভিযাত্রী”, “দ্য ট্রাভেলার্স নেটওয়ার্ক”, “রোভার্স বাংলাদেশ”, “ট্রাভেল অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ এক্সপ্লোরার্স”, “ঘুরবো বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ ট্রেকিং ক্লাব”, “ট্রাভেলম্যানিয়া বাংলাদেশ”, “বাংলাদেশ ভ্রমণ পরিবার”, “ভ্রমণবন্ধু”, “ট্রাভেল লাভার্স অব বাংলাদেশ”, “যাযাবর বাংলাদেশ”, “ভ্রমণ ক্যাফে”, “অফবিট ট্রাভেলার্স বাংলাদেশ”, “ট্রাভেল স্টোরি বাংলাদেশ” এবং “বাংলাদেশ ব্যাকপ্যাকার্স ইউনিয়ন”।

এসব কমিউনিটির মাধ্যমে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভ্রমণ পরিকল্পনা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, নিরাপদ ট্যুর আয়োজন এবং দেশের অজানা সৌন্দর্য তুলে ধরার কাজ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই ভ্রমণ আন্দোলন আগামী দিনে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আরও বড় উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।