একসময় পাসপোর্ট ছিল শুধু বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, শিল্পবোধ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক। আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশ এখন তাদের পাসপোর্টে যুক্ত করছে অতিবেগুনি রশ্মিতে দৃশ্যমান গোপন নকশা, অ্যানিমেটেড পৃষ্ঠা, মাইক্রোপ্রিন্টিং, বিশেষ জলছাপ ও উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি।
ফলে কিছু পাসপোর্ট এখন কেবল ভ্রমণ নথি নয়, বরং নান্দনিক শিল্পকর্ম হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পাসপোর্টের গোপন ডিজাইন ও ভিজ্যুয়াল বৈশিষ্ট্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের এমন ৮টি পাসপোর্ট নিয়ে এই আয়োজন।
নরওয়ে
আধুনিক পাসপোর্ট ডিজাইনের অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় নরওয়ের পাসপোর্টকে। এর পাতাজুড়ে রয়েছে দেশটির ফিয়র্ড, পাহাড়, বনভূমি ও উপকূলীয় এলাকার নান্দনিক চিত্র।
তবে আসল আকর্ষণ দেখা যায় অতিবেগুনি রশ্মির আলোতে। তখন পাতাজুড়ে ভেসে ওঠে নর্দার্ন লাইট বা অরোরা বোরিয়ালিসের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পাসপোর্টটি ডিজাইন করেছে নরওয়ের ‘নয়ে ডিজাইন স্টুডিও’।
লাটভিয়া
লাটভিয়ার পাসপোর্ট বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে এর গোপন অতিবেগুনি শিল্পকর্মের কারণে। সাধারণ আলোতে যা দেখা যায় না, অতিবেগুনি আলোতে তখন দৃশ্যমান হয় বন, নদী, নেকড়ে, গাছপালা ও গ্রামীণ প্রাকৃতিক দৃশ্য।
জালিয়াতি প্রতিরোধে এতে ব্যবহার করা হয়েছে অদৃশ্য কালি, মাইক্রোপ্রিন্টিং ও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অন্য অনেক দেশ অতিবেগুনি নকশা ব্যবহার করলেও লাটভিয়ার পাসপোর্টে সম্পূর্ণ লুকানো প্রাকৃতিক দৃশ্য বিশেষভাবে আলাদা করে তুলেছে এটিকে।
কানাডা
কানাডার পাসপোর্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠে এর লুকানো অতিবেগুনি ডিজাইনের কারণে। অতিবেগুনি আলোতে পাতাজুড়ে দেখা যায় রঙিন আতশবাজি, ম্যাপল পাতার নকশা ও দেশটির বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর আলোকিত চিত্র।
নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যকে কীভাবে নান্দনিক শিল্পে রূপ দেওয়া যায়, কানাডার পাসপোর্ট তার অন্যতম উদাহরণ।
ফিনল্যান্ড
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী পাসপোর্টগুলোর তালিকায় ফিনল্যান্ডের নাম দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এর আগের সংস্করণে পাতাগুলো দ্রুত ওল্টালে দেখা যেত হাঁটতে থাকা একটি মুজ হরিণের অ্যানিমেশন।
২০২৬ সালে দেশটি নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট চালু করেছে। এতে আর্কিপেলাগো সাগর অঞ্চল ও দেশটির বন্যপ্রাণীর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষভাবে ধূসর সিল প্রাণীর নকশা এতে যুক্ত করা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ড
২০২২ সালে চালু হওয়া সুইজারল্যান্ডের নতুন পাসপোর্টকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পাসপোর্টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জেনেভাভিত্তিক ‘রেটিনা’ স্টুডিওর ডিজাইন করা এই পাসপোর্টে রয়েছে টপোগ্রাফিক লাইন, জলপথের মানচিত্র, জ্যামিতিক নকশা ও সুইস ভূপ্রকৃতির অনুপ্রেরণায় তৈরি শিল্পকর্ম।
অতিবেগুনি আলোতে এতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাহাড়ি অঞ্চল, স্থাপত্য ও মানচিত্রভিত্তিক নকশা। প্রচলিত লাল কভার বজায় রাখা হলেও ভেতরের নকশায় আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন।
জাপান
শিল্প ও নিরাপত্তা প্রযুক্তির অনন্য সমন্বয়ের জন্য পরিচিত জাপানের পাসপোর্ট। ২০২০ সালের পুনঃনকশার পর প্রতিটি ভিসা পাতায় যুক্ত করা হয় শিল্পী কাতসুশিকা হোকুসাইয়ের বিখ্যাত ‘থার্টি সিক্স ভিউস অব মাউন্ট ফুজি’ সিরিজের চিত্রকর্ম।
প্রতিটি দুই পাতায় মাউন্ট ফুজির ভিন্ন ভিন্ন শিল্পরূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ২০২৫ সালে এতে আরও যুক্ত হয় পলিকার্বনেট ফটো পৃষ্ঠা, লেজার খোদাই প্রযুক্তি, সাকুরা নকশা ও সারস পাখির জলছাপ।
নিউজিল্যান্ড
কালো কভারের কারণে নিউজিল্যান্ডের পাসপোর্ট সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। এর ওপর খোদাই করা থাকে রুপালি ফার্ন গাছের প্রতীক, যা দেশটির জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালুর পর এতে যুক্ত করা হয়েছে দ্বিভাষিক লেখা, ভ্রমণ ও নৌযাত্রাকেন্দ্রিক শিল্পনকশা এবং রুপালি অলংকরণ। ২০২১ সালের সংস্করণে “উরুভেনুয়া আওতেরোয়া” এবং “নিউজিল্যান্ড পাসপোর্ট” লেখা বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্টে দেশটির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাতাজুড়ে রয়েছে ক্যাঙ্গারু, ইমু, ওয়াটল ফুল ও উপকূলীয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি।