ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্য ফ্রান্সের শামোনি। মন্ট ব্লাঁর পাদদেশে গড়ে ওঠা এই শহর বহুদিন ধরেই স্কিইং, পর্বতারোহণ ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের স্বপ্নের ঠিকানা। তবে শুধু শীতকাল নয়, গ্রীষ্মেও শামোনি ভ্রমণকারীদের কাছে সমান আকর্ষণীয়। বরফঢাকা পর্বত, স্বচ্ছ হ্রদ, মনোমুগ্ধকর ট্রেইল আর প্রাণবন্ত শহুরে আবহ মিলিয়ে এটি এখন চার ঋতুর পর্যটনকেন্দ্র।
১৭৪১ সালে ব্রিটিশ অভিযাত্রী উইলিয়াম উইন্ডহ্যাম ও রিচার্ড পোকক প্রথম এই অঞ্চলকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত করে তোলেন। পরে ১৯২৪ সালে শামোনিতে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের প্রথম শীতকালীন অলিম্পিক। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও শহরটি ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত পর্বত পর্যটনকেন্দ্র।
এগুই দু মিডির চূড়ায় কেবল কার ভ্রমণ
শামোনির সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হলো এগুই দু মিডিতে ওঠা। মন্ট ব্লাঁ পর্বতমালার অংশ এই শৃঙ্গের উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ৮৪২ মিটার। এখান থেকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও ইতালির আল্পস পর্বতমালার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়।
টেলিফেরিক দে এগুই দু মিডি কেবল কারে চড়ে শামোনি থেকে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় পাহাড়ের ওপরে। মাঝপথে প্লান দ্য এগুই দু মিডি স্টেশনে কেবল কার বদলাতে হয়। সেখানে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে কফি বা গরম পানীয় উপভোগের সুযোগও রয়েছে।
ভ্রমণকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, গ্রীষ্মকালেও এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। তাই উষ্ণ পোশাক সঙ্গে রাখা জরুরি।
নতুন রূপে ফিরছে মিউজে দ্যু মন্ট ব্লাঁ
দীর্ঘ পাঁচ বছরের সংস্কার শেষে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আবার চালু হচ্ছে মিউজে দ্যু মন্ট ব্লাঁ। আগে এটি মিউজে আলপ্যাঁ নামে পরিচিত ছিল।
ইউরোপের উচ্চতম জাদুঘর কমপ্লেক্সগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই জাদুঘরে মন্ট ব্লাঁ অঞ্চলের ইতিহাস, পর্বতারোহণ সংস্কৃতি এবং শিল্পভিত্তিক প্রদর্শনী থাকবে। শামোনির ঐতিহ্য জানতে আগ্রহীদের জন্য এটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
মের দ্য গ্লাসে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র
মন্ট ব্লাঁর উত্তর ঢালে অবস্থিত ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় হিমবাহ মের দ্য গ্লাস। প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই হিমবাহ বহু বছর ধরে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
১৯০৯ সালে চালু হওয়া ট্রেন দ্যু মন্টনভের্স নামের পাহাড়ি রেলপথ ধরে পর্যটকরা পৌঁছাতে পারেন মন্টনভের্স এলাকায়। সেখান থেকে কেবল কার ও সিঁড়ি ব্যবহার করে যাওয়া যায় বিখ্যাত গ্রোত দ্য গ্লাস বরফগুহায়।
পথে বিভিন্ন স্থানে লাগানো ফলকে ১৯৮৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে হিমবাহের উচ্চতার পরিবর্তন দেখানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাছ থেকে বুঝতে এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
ক্রিস্টালের জগতে অন্যরকম অভিজ্ঞতা
মিউজে দে ক্রিস্তো ছোট হলেও বেশ আকর্ষণীয় একটি জাদুঘর। এখানে মন্ট ব্লাঁ অঞ্চল থেকে সংগৃহীত নানা ধরনের খনিজ ও স্ফটিক প্রদর্শন করা হয়।
২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে খনিজবিদ ও রত্নবিশেষজ্ঞ রেমন্ড থিবোর সংগ্রহ থেকে বিশেষ প্রদর্শনী চলবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত শতাধিক বিরল নমুনা এতে স্থান পেয়েছে।
ল্য ব্রেভঁ থেকে হাইকিং ও প্যারাগ্লাইডিং
শামোনি উপত্যকার পশ্চিম পাশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ল্য ব্রেভঁ। প্রায় ২ হাজার ৫২৫ মিটার উচ্চতার এই এলাকা থেকে মন্ট ব্লাঁর অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।
এখানে প্যারাগ্লাইডিং, রক ক্লাইম্বিং এবং স্কিইংয়ের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পরিবার নিয়ে হাঁটার জন্যও রয়েছে মনোরম ট্রেইল। প্লানপ্রাজ এলাকা থেকে গ্রঁ বালকঁ সুদ কিংবা লাক ব্লঁর দিকে ট্রেইল ধরে যাওয়া যায়।
ল্য ব্রেভঁ পৌঁছাতে প্রথমে টেলেকাবিন দ্য প্লানপ্রাজ এবং পরে টেলিফেরিক দ্য ব্রেভঁ ব্যবহার করতে হয়।
লাক ব্লঁর নীলাভ সৌন্দর্য
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৩৫২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লাক ব্লঁ শামোনির অন্যতম সুন্দর হিমবাহ হ্রদ। চারপাশের সুউচ্চ পাহাড় আর স্বচ্ছ পানির জন্য এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
জুনের শেষ ভাগ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হাইকিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। তুলনামূলক সহজ ট্রেইলের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জিং পথও রয়েছে।
তবে হ্রদের পরিবেশ রক্ষায় এখানে সাঁতার ও জলক্রীড়া নিষিদ্ধ। তবু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এটি শামোনির অন্যতম সেরা গন্তব্য।