বিশ্বের প্রায় সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রকে ডাকে আমেরিকা, ইউএসএ বা ‘যুক্তরাষ্ট্র’ নামে। কিন্তু বাংলাদেশে খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত শব্দ— মার্কিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট।মার্কিন নির্বাচন। মার্কিন দূতাবাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মার্কিন শব্দটা এলো কোথা থেকে? এবং কেন শব্দটার ব্যবহার শুধু বাংলা ভাষাতেই দেখা যায়?

বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী, ‘মার্কিন’ শব্দের অর্থ আমেরিকান বা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কিত। তবে শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। যতটুকু নথিপত্র পাওয়া যায়, তাতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা কঠিন।

ভাষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, ‘মার্কিন’ এসেছে ‘আমেরিকান’ শব্দের বাংলা রূপান্তর থেকে। ‘আমেরিকান’ শব্দের মাঝখানের ‘মেরিক’ অংশ থেকেই ধীরে ধীরে ‘মার্কিন’ তৈরি হয়। ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হচ্ছে, উনিশ ও বিশ শতকের শুরুর বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দকে স্থানীয় উচ্চারণে বদলে নেওয়ার প্রবণতা খুব শক্তিশালী ছিল। যেমন— ‘ইংলিশ’ থেকে ‘ইংরেজ’, ‘ফরাসি’ এসেছে ‘ফ্রেঞ্চ’ থেকে, আবার ‘জার্মান’  থেকে হয়েছে ‘জার্মানি’। ‘মার্কিন’ শব্দটি নিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যাও আছে।

কিছু পুরোনো বাংলা লেখায় দাবি করা হয়েছে, ব্রিটিশ আমলে ‘মার্কিন কাপড়’ নামে এক ধরনের বিদেশি কাপড় পরিচিত ছিল।
ধারণা করা হয়, এই কাপড় আমেরিকা থেকে আসত বা আমেরিকান কাপড় হিসেবেই পরিচিত ছিল। সেখান থেকেই ‘মার্কিন’ শব্দটি সাধারণ মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এই ‘মার্কিন কাপড়’ তত্ত্বের পক্ষে শক্ত কোনো প্রামাণ্য গবেষণা বা নির্ভরযোগ্য ভাষাতাত্ত্বিক দলিল খুব একটা পাওয়া যায়নি। এটি মূলত লোকমুখে প্রচলিত ব্যাখ্যা।

অন্যদিকে ‘আমেরিকান’ শব্দের বাংলা রূপান্তর থেকে ‘মার্কিন’ এসেছে— এই ব্যাখ্যাটি ভাষাবিদদের কাছে তুলনামূলক বেশি গ্রহণযোগ্য।
গবেষকরা বলছেন, ‘মার্কিন’ শব্দের জনপ্রিয়তা শুরু হয় মূলত ব্রিটিশ ভারতের বাংলা সংবাদপত্রে। বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাংবাদিকতায়।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আনন্দবাজার, যুগান্তর কিংবা অন্যান্য বাংলা পত্রিকায় ‘মার্কিন’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
পত্রিকায় ব্যবহারের কারণ হিসেবে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র শব্দটি তুলনামূলক দীর্ঘ, আর ‘আমেরিকান’ পুরোটা লিখতেও জায়গা বেশি লাগত।
সংবাদ শিরোনামের জন্য ছোট ও শক্তিশালী শব্দ দরকার ছিল। ‘মার্কিন’ শব্দটি সেই কাজটাই সহজ করে দেয়।
এদিকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবাদপত্রে ‘মার্কিন’ শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সময় ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’ ‘মার্কিন নীতি’— এসব রাজনৈতিক ভাষ্য শব্দটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ভাষা গবেষক এবং বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ছোট, জোরালো ও রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ শব্দ ব্যবহারে বেশি আগ্রহী ছিল। ‘মার্কিন’ শব্দটি সেই ধারা থেকেই টিকে যায়।

সবমিলিয়ে বলা যায়, ‘মার্কিন’ শব্দটা হয়তো কোনো অভিধানঘেঁষা নিখুঁত অনুবাদ নয়। হতে পারে এর পেছনে আছে ভাষার রূপান্তর, আবার লোকমুখে প্রচলিত ‘মার্কিন কাপড়ের’ গল্পও। ইতিহাস, সাংবাদিকতা আর বাংলা ভাষার অভিযোজন মিলিয়ে এটা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের একেবারে নিজস্ব এক শব্দ। আর সে কারণেই পৃথিবীর অন্য কোথাও ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ বলা হলেও বাংলাদেশে সেটা হয়ে যায় ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট’।