বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের আরোহণ কার্যক্রম। তবে এবার অভিযানের শুরুতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা। গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রেইলের ওপর ঝুলে আছে বিশাল ও অস্থিতিশীল বরফখণ্ড, যেটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবুও উচ্চ ব্যয় ও বাড়তি পারমিট ফি উপেক্ষা করে শত শত পর্বতারোহী এভারেস্ট জয়ের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে প্রায় ৪১০ জন বিদেশি পর্বতারোহী এবং সমসংখ্যক নেপালি গাইড বেস ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। অনুকূল আবহাওয়ার স্বল্প সময়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এ মাসেই প্রায় ৮ হাজার ৮৫০ মিটার উচ্চতার চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করবেন তারা।
বরফখণ্ডের কারণে দুই সপ্তাহ বিলম্ব
গত মাসে অভিযাত্রীরা ৫ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বেস ক্যাম্পে জড়ো হন। তবে বিশাল একটি অস্থিতিশীল বরফখণ্ড বা ‘সেরাক’ অভিযানের অগ্রগতি দুই সপ্তাহের বেশি সময় আটকে দেয়।
প্রতি বছর এভারেস্টের রুট নির্ধারণের কাজ করেন সগরমাতা পলিউশন কন্ট্রোল কমিটি-এর বিশেষজ্ঞ গাইডরা, যাদের ‘আইসফল ডাক্তার’ বলা হয়। তারা দড়ি ও মই বসিয়ে পথ তৈরি করেন। সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি কাজ শেষ হলেও এবার তা বিলম্বিত হয়।
শেষ পর্যন্ত ২৯ এপ্রিল খুম্বু আইসফলের রুট খুলে দেওয়া হয়। তবে এর সঙ্গে কঠোর সতর্কবার্তাও দেয় কর্তৃপক্ষ। তারা জানায়, বরফখণ্ডটিতে একাধিক ফাটল রয়েছে এবং এটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। নতুন তৈরি পথটিও ওই বিপজ্জনক অংশের নিচ দিয়েই গেছে।
খুম্বু আইসফল: এভারেস্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ
এই সেরাকটি খুম্বু আইসফলের অংশ। এটি একটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হিমবাহ অঞ্চল, যেখানে রয়েছে গভীর ফাটল এবং বহুতল ভবনের সমান বিশাল বরফস্তূপ। এভারেস্ট অভিযানের সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত খুম্বু আইসফল।
অভিযান পরিচালনাকারীরা পরিস্থিতি নিয়ে যেমন সতর্ক, তেমনি উদ্বিগ্নও। খ্যাতিমান পর্বতগাইড লুকাস ফুরটেনবাখ জানান, তার দলে রয়েছেন ৪০ জন আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী, ১১ জন গাইড এবং ৯০ জন শেরপা। তিনি বলেন, “যে বলবে সে উদ্বিগ্ন নয়, সে হয় অনভিজ্ঞ, নয়তো পরিস্থিতি বুঝছে না। এই সেরাক বাস্তব এবং বড় ধরনের ঝুঁকি।”
তার ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার পথ আরও জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ অনেক জায়গায় অস্থিতিশীল বরফস্তূপের নিচ দিয়ে যেতে হচ্ছে।
সকালে তুলনামূলক নিরাপদ, দুপুরে বাড়ে ঝুঁকি
অভিযানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোরের দিকে বরফ জমাট থাকায় চলাচল কিছুটা নিরাপদ থাকে। তবে দুপুরের দিকে তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলতে শুরু করে এবং ধসের আশঙ্কা বাড়ে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক এশিয়ান ট্রেকিং-এর কর্মকর্তা আং ছিরিং শেরপা বলেন, “এ বছর খুব সতর্ক থাকা জরুরি। দুপুরের পর পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।”
২০১৪ সালে খুম্বু আইসফলে সেরাক ধসে সৃষ্ট তুষারধসে ১৬ জন নেপালি গাইড ও কর্মী নিহত হন। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে, যা এভারেস্ট অঞ্চলে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ২০২৩ সালে আন্তোনিও গুতেরেস নেপাল সফরে গিয়ে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়াকে ভয়াবহ সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
পশ্চিমা অভিযাত্রী কমলেও বেড়েছে এশীয়দের সংখ্যা
অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ এবং ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব কিছুটা পড়লেও এবারও এভারেস্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক পর্বতারোহী রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অভিযাত্রীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও এশিয়ার দেশগুলো থেকে আগ্রহ বেড়েছে।
এবার আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, চীন এ বছর এভারেস্টের উত্তর দিকের রুট বন্ধ রেখেছে। ফলে সব পর্বতারোহীকেই দক্ষিণ দিক দিয়ে নেপাল হয়ে আরোহণ করতে হচ্ছে।
১৯৫৩ সালের ২৯ মে এডমন্ড হিলারি এবং শেরপা গাইড তেনজিং নোরগে প্রথম এভারেস্ট জয় করার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গটিতে আরোহণ করেছেন।