বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া ব্যাপকভাবে সীমিত করে দেয় ভারত। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আর ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়ে যাওয়ার মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নাগরিক সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল ভয়েসেস’ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ভিসা বন্ধের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতও বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অলাভজনক সংবাদমাধ্যমটির হিসাবে, একসময় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার ভিসা ইস্যু করত। এখন সীমিত আকারে মূলত জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়া হচ্ছে।

থমকে গেছে কোটি টাকার ব্যবসা
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২১ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেন। তারা চিকিৎসা, কেনাকাটা, পারিবারিক সফর ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভারতে যেতেন। এতে ভারতের হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ছোট ব্যবসাগুলো বিপুলভাবে লাভবান হতো।
কিন্তু ভিসা সীমিত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও সদর স্ট্রিট এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ, যা ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ছিল। একসময় বাংলাদেশি পর্যটকে ভরা এই এলাকায় এখন ব্যবসা প্রায় অচল।
প্রাথমিক হিসাবে, শুধু এই অঞ্চলে ভারতের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি। নিউ মার্কেট ও বড়বাজারসহ পুরো এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি রুপিরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি রুপির ব্যবসা হারিয়ে যাচ্ছে। হোটেল বুকিং ৮০-৯০ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বহু মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রাভেল এজেন্সি ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে।

বিপর্যস্ত ‘চিকিৎসা পর্যটন’
ভারতের ‘চিকিৎসা পর্যটন’ খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশটির মোট মেডিকেল ট্যুরিস্টদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি।
২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বরে কমে ৫৯ শতাংশে দাঁড়ায়।
আগে হৃদরোগ, ক্যানসারসহ নানা জটিল চিকিৎসার জন্য কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশিদের ভিড় থাকত। এখন সেই হাসপাতালগুলোর অনেক শয্যা খালি পড়ে আছে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস ও মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনও বন্ধ রয়েছে, যা রোগীদের যাতায়াত আরও কঠিন করে তুলেছে।

নতুন গন্তব্যে বাংলাদেশিরা
বাংলাদেশি রোগীরা বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া বন্ধ করেননি, বরং নতুন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন বলে গ্লোবাল ভয়েসেস লিখেছে।
থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি রোগীদের আগ্রহ ২০০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানা গেছে। দেশটির হাসপাতালগুলো সহজ ভিসা ও চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে।
একইভাবে চীনও এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চিকিৎসা সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনা চলছে। ঢাকায় “ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল” গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পর্যটনে শ্রীলঙ্কা-মালদ্বীপের উত্থান
ভারতের বদলে এখন বাংলাদেশি পর্যটকদের বড় অংশ শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে যাচ্ছেন।
২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১২১ শতাংশ বেড়েছে। মালদ্বীপে বেড়েছে ৫২ শতাংশ। নেপালেও পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের বিদেশগামী পর্যটকদের ৪০-৪৫ শতাংশ ভারতে যেতেন। সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, নিকটতা ও পারিবারিক যোগাযোগের কারণে ভারত ছিল স্বাভাবিক প্রথম পছন্দ। কিন্তু সেই অবস্থান এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

‘মানুষে-মানুষে সম্পর্ক’-এর সংকট
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বাংলাদেশ-ভারত প্রসঙ্গে ‘মানুষে-মানুষে সম্পর্কের’ কথা বলেন। কিন্তু ভিসা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্পর্কই এখন সংকটে পড়েছে।
বিয়ে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অনেকেই আত্মীয়দের কাছে যেতে পারছেন না। ব্যবসায়িক সম্পর্কেও তৈরি হয়েছে দূরত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

হারাচ্ছে ভারত, ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশও
এই কড়াকড়ির ফলে ভারত যেমন রাজস্ব, ব্যবসা ও প্রভাব হারাচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশও সহজ চিকিৎসাসেবা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষতি স্থায়ী রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভ্রমণ ও চিকিৎসা মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।