জাপানের রাজধানী টোকিওর ব্যস্ত নিহোনবাশি এলাকায় আকাশছোঁয়া ভবন, করপোরেট অফিস আর অভিজাত শপিংমলের ভিড়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরেরও পুরোনো ছোট্ট একটি শিন্তো মন্দির। নাম ফুকুতোকু শ্রাইন। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও, এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে এক অদ্ভুত বিশ্বাস—এখানে প্রার্থনা করলে নাকি প্রিয় শিল্পীর কনসার্টের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সেখানে আসেন। তবে স্বাস্থ্য, সম্পদ বা সৌভাগ্যের জন্য নয়; তাদের একটাই প্রার্থনা—প্রিয় ব্যান্ড বা গায়কের লাইভ কনসার্টে যাওয়ার সুযোগ।
লটারি থেকে কনসার্ট টিকিট
নবম শতকে নির্মিত ফুকুতোকু শ্রাইন মূলত ইনারি দেবতাকে উৎসর্গ করে গড়ে ওঠে। জাপানি বিশ্বাস অনুযায়ী, ইনারি সমৃদ্ধি ও ভালো ফসলের দেবতা। ১৫৯০ সালে প্রভাবশালী সামুরাই শাসক তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু এই মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করলে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
পরে এখানে লটারির আয়োজনের অনুমতিও দেওয়া হয়। সেই লটারির আয় দিয়ে মন্দিরের উন্নয়ন করা হতো এবং বিজয়ীরা পেতেন অর্থ পুরস্কার। ধীরে ধীরে ফুকুতোকু “সৌভাগ্যের মন্দির” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সেই সৌভাগ্যের ধারণা নতুন রূপ নেয়। ১৯৯০-এর দশকে জে-পপ সংস্কৃতির বিস্ফোরণের পর লাখো তরুণ-তরুণী তাদের প্রিয় তারকাদের নিয়ে এক ধরনের ভক্তিমূলক সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েন।
জাপানে “ওশি” নামে একটি জনপ্রিয় শব্দ আছে। এর অর্থ—যে শিল্পী বা ব্যান্ড সদস্যকে কেউ সবচেয়ে বেশি সমর্থন ও ভালোবাসেন।
ভক্তরা নিজেদের “ওশি”-কে সমর্থন জানাতে টি-শার্ট, ব্যাগ, ব্যাজসহ নানা সামগ্রী কেনেন। কিন্তু সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি অনেক সময় অর্থ দিয়েও পাওয়া যায় না—কনসার্টের টিকিট।
টিকিট পেতে ভাগ্যের লড়াই
জাপানের বড় কনসার্টগুলোতে সাধারণত অনলাইন লটারি পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রি করা হয়। আগ্রহীরা আবেদন করেন, এরপর ভাগ্যবানদের মধ্য থেকেই সীমিত সংখ্যক টিকিট কেনার সুযোগ দেওয়া হয়।
এই ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য মনে করা হলেও, অনেক ভক্ত বিশ্বাস করেন—শুধু আবেদন করলেই হবে না, ভাগ্যের সহায়তাও দরকার। আর সেই কারণেই তারা ছুটে আসেন ফুকুতোকু মন্দিরে।
টোকিওভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতা সাইবার বানি বলেন, “জাপানিদের একটি কথা আছে—তুমি যা পারো করো, বাকিটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দাও। অনেকে মনে করেন, মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করা অন্তত কিছু না করার চেয়ে ভালো।”
প্রার্থনার ভিড়ে বন্ধ হয়েছিল রাস্তা
করোনাভাইরাস মহামারির সময় কনসার্ট বন্ধ থাকলেও ভক্তদের আবেগ থেমে থাকেনি। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর আবার যখন শিল্পীরা ট্যুর শুরু করেন, তখন ফুকুতোকু মন্দিরে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
ভ্রমণগাইড উলি নাম্বো জানান, “মানুষ এত বেশি ছিল যে প্রার্থনার জায়গাই দেখা যাচ্ছিল না। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে রাস্তা পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছিল।”
মন্দিরে এসে ভক্তরা প্রথমে পানির ফোয়ারায় হাত ও মুখ ধুয়ে নিজেদের শুদ্ধ করেন। এরপর মূল বেদির সামনে মাথা নত করেন, দুবার হাততালি দিয়ে দেবতাকে আহ্বান জানান এবং নীরবে প্রার্থনা করেন।
অনেকে পরে “এমা” নামে ছোট কাঠের ফলক কেনেন। সেগুলোর দাম সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ইয়েন। এরপর সেখানে নিজের ইচ্ছা লিখে ঝুলিয়ে দেন।
কেউ লিখছেন বিটিএসের কনসার্টে যেতে চান, কেউ জিরোবেসওয়ানের শো দেখতে চান। সবার লক্ষ্য একটাই—লটারিতে জিতে প্রিয় শিল্পীকে সরাসরি দেখা।
ধর্ম নাকি ব্যক্তিগত সুখের খোঁজ?
জাপানের প্রাচীন শিন্তো ধর্মে কঠোর বিধিনিষেধ বা চূড়ান্ত কোনো মতবাদ নেই। বরং জীবনের ছোট ছোট আনন্দ ও বর্তমান মুহূর্তকেই পবিত্র হিসেবে দেখা হয়।
তাহলে কনসার্টের টিকিটের মতো সাময়িক কোনো কিছুর জন্য প্রার্থনা করা কি গ্রহণযোগ্য?
কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ভাষার অধ্যাপক বেথ কার্টারের মতে, এটিকে কেবল বস্তুগত চাওয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তার ভাষায়, “যখন কেউ কাঙ্ক্ষিত কিছু পায়, তখন সে মানসিক শান্তি ও আনন্দ অনুভব করে। সেই অনুভূতিই অনেক সময় তাকে গভীরতর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত করে।”
ওসাকার হাত্তোরি তেনজিনগু মন্দিরের পুরোহিত তাইশি কাতোও একই মত দেন। তিনি বলেন, মানুষ যদি আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেন এবং দেবতার প্রতি সম্মান দেখান, তাহলে যেকোনো আনন্দের জন্য প্রার্থনা করাই গ্রহণযোগ্য।
প্রার্থনার পর মিলেছিল টিকিট
টোকিওভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সোরানিউজ২৪-এর প্রতিবেদক ক্রিস্টা রজার্সও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার প্রিয় শিল্পী আয়ুমি হামাসাকির কনসার্টের টিকিটের জন্য প্রথমবার আবেদন করেও তিনি ব্যর্থ হন।
পরে শিল্পীটি আবার ট্যুর ঘোষণা করলে তিনি আর শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করেননি। সোজা চলে যান ফুকুতোকু মন্দিরে।
রজার্স হাসতে হাসতে বলেন, “আমি প্রার্থনা করেছিলাম, আর কোনোভাবে সত্যিই টিকিট পেয়ে গিয়েছিলাম।”