ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ ক্যাম্পাস যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত উদ্ভিদ পাঠশালায়। অচেনা ও দুর্লভ প্রজাতির গাছের সমারোহে সাজানো এই ক্যাম্পাসে হাঁটলেই চোখে পড়ে বৈচিত্র্যের ছাপ। অবহেলা ও অযত্নের মাঝেও টিকে থাকা এসব বৃক্ষ শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।

ক্যাম্পাসের এক প্রান্তে লতাপাতায় আচ্ছাদিত জায়গা পেরিয়ে দেখা মেলে কৃষ্ণবট ও রুদ্রাক্ষ গাছের। প্রবেশমুখে ছাতিম গাছের সারি আর মুক্তমঞ্চের পাশে বোতল ব্রাশের লাল ফুল মিলিয়ে পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়।

কৃষ্ণবটের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশে একসময় বিভিন্ন প্রজাতির বটগাছ সহজেই দেখা যেত। এখন তা অনেকটাই বিরল। আনন্দ মোহন কলেজের কৃষ্ণবট গাছটি আকারে খুব বড় না হলেও এর পাতার গঠন একে আলাদা করে তুলেছে। পাতাগুলো এমনভাবে গঠিত, যেন নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো।

পাতার দৈর্ঘ্য সাধারণত ৮ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার। পাতার ডাঁটা ভাঙলে সাদা আঠালো কষ বের হয়। এই গাছ সম্পূর্ণ পাতা ঝরায় না এবং ঘন ছায়াও তৈরি করে না। উচ্চতা ৮ থেকে ২২ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফল ছোট এবং পাকা অবস্থায় লাল হয়। গাছটির শিকড়, পাতা ও ফল আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

রুদ্রাক্ষে পৌরাণিক আবহ

শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই নজর কাড়ে রুদ্রাক্ষ গাছ। থোকায় থোকায় সাদা ফুল ও মিষ্টি সুবাস পরিবেশকে করে তোলে মনোমুগ্ধকর। মাটিতে ঝরে পড়া ফুল দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই বিছিয়ে দিয়েছে ফুলের আস্তরণ।

রুদ্রাক্ষ একটি চিরসবুজ বৃক্ষ, যা ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। ফুল দেখতে জলপাই ফুলের মতো এবং হালকা ঘিয়া-সাদা রঙের। ফল গাঢ় নীল, যার ভেতরের শক্ত অংশই রুদ্রাক্ষ হিসেবে পরিচিত। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ও পৌরাণিক বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

বোতল ব্রাশে রঙের ছোঁয়া

ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে বোতল ব্রাশ গাছ। লাল রঙের ব্রাশের মতো দেখতে ফুল সহজেই নজর কাড়ে। বসন্তে ফুল বেশি ফুটলেও শরৎকালেও এর দেখা মেলে।

এই গাছ সাধারণত ৬ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়া হলেও এখন বাংলাদেশে সৌখিন গাছ হিসেবে রোপণ করা হয়। স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ভালো জন্মে এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। বছরে একাধিকবার ফুল ফোটে, যা পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

ছাতিমের ছায়া ও সুবাস

প্রবেশপথের দুই পাশে থাকা ছাতিম গাছ পথচারীদের জন্য স্বস্তির ছায়া তৈরি করে। ছোট হলেও এর ফুলের সুবাস চারপাশ ভরে রাখে। অনেকেই এখানে এসে কিছুটা বিশ্রাম নেন।

ছাতিম গাছ ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। সাতটি পাতা একসঙ্গে জন্মায় বলে একে ‘সপ্তপর্ণ’ও বলা হয়। এর ফুল ছোট, সাদা এবং থোকায় থোকায় জন্মায়। গাছের ভেতরে তেঁতো কষ থাকে, যা ঔষধি গুণসম্পন্ন।

যেভাবে যাবেন

আনন্দ মোহন কলেজ ময়মনসিংহ শহরের ছোটবাজার এলাকায় অবস্থিত। ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে ট্রেন বা বাসে ময়মনসিংহ পৌঁছে রিকশা বা অটোরিকশায় সহজেই যাওয়া যায়। বড় স্টেশন থেকে কলেজের দূরত্ব ১০ থেকে ১৫ মিনিট।