বিমান ভ্রমণ এখন আর আগের মতো আনন্দদায়ক নয়। দীর্ঘ লাইন, যাত্রা বিলম্ব, আর বাড়তি খরচ অনেক সময় যাত্রাকে ক্লান্তিকর করে তোলে। তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে যাত্রীদের জন্য আসছে একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
নতুন প্রযুক্তি ও ডিজাইন বিমান ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক, ব্যক্তিগত এবং উপভোগ্য করে তুলতে যাচ্ছে বলে ইউরো নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই এমন কিছু উদ্ভাবনী ধারণা তুলে ধরেছে, যা খুব শিগগিরই বাস্তবে দেখা যেতে পারে।
সিটেই সিনেমা হল: চারদিক ঘিরে স্ক্রিন
রেভ অ্যারোস্পেস এবং সাফরান সিটস যৌথভাবে ‘অরিজিন’ নামে একটি ভবিষ্যতধর্মী সিট ডিজাইন উন্মোচন করেছে। এতে রয়েছে ইউ-আকৃতির চারপাশ ঘিরে থাকা মাইক্রো-এলইডি স্ক্রিন (র্যাপারাউন্ড স্ক্রিন), যা যাত্রীকে এক ধরনের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতায় নিয়ে যাবে।
যাত্রীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী আলো, পরিবেশ এমনকি ডিজিটাল দৃশ্যও বদলাতে পারবেন। এতে হেডফোন ছাড়াই অডিও শোনার সুবিধা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং আরামদায়ক কুশনও থাকবে, বিশেষ করে দীর্ঘ যাত্রার জন্য।
ইকোনমিতেই বাড়তি আরাম: দুই স্তরের সিট
স্পেনের স্টার্টআপ শেইজ লং তৈরি করেছে দুই স্তরের সিট। এতে কেবিনের উচ্চতা ব্যবহার করে যাত্রীদের জন্য বেশি জায়গা তৈরি করা হয়েছে।
নিচের সারির যাত্রীরা পাবেন বেশি লেগরুম, আর উপরের সারিতে থাকবে বাড়তি প্রাইভেসি। এই ডিজাইন ইকোনমি ক্লাসেই বিজনেস ক্লাসের মতো আরাম দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
আকাশেই অফিস: ‘ফোন বুথ’ ওয়ার্ক পড
বোয়িং নিয়ে এসেছে ‘ফোন বুথ’ স্টাইলের ‘ওয়ার্ক পড’। এটি ছোট, নিরিবিলি একটি কাজের জায়গা, যেখানে বসে ভিডিও কল, অফিসের কাজ বা একটু নির্জনে সময় কাটানো যাবে।
এই পডগুলোতে থাকবে শব্দনিরোধক বা সাউন্ডপ্রুফ দেয়াল, চার্জিং পোর্ট, আলো এবং ছোট ডেস্ক, যা বিমানের ভেতর নতুন ধরনের ‘তৃতীয় স্থান’ তৈরি করবে।
ফার্স্ট ক্লাসে ব্যক্তিগত বাথরুম
এমিরেটস ভবিষ্যতে তাদের ফার্স্ট ক্লাসে ব্যক্তিগত বাথরুমসহ স্যুট চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্যিক বিমানে এটি হতে পারে প্রথম বড় আকারের উদ্যোগ। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি বিমানে শাওয়ার সুবিধা চালু করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
পাশের সিট খালি রাখার সুযোগ
অনেক যাত্রীরই স্বপ্ন, পাশের সিটটি খালি থাকুক। এখন কিছু এয়ারলাইন্স অতিরিক্ত খরচে সেই সুবিধা দিচ্ছে।
উইজ এয়ার তাদের ‘উইজ ক্লাসে’ যাত্রীদের পাশের সিট খালি রাখার সুযোগ দিচ্ছে। একইভাবে এয়ার ফ্রান্স ‘এম্পটি সিট’ সুবিধার মাধ্যমে একাধিক সিট ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে।
ইকোনমিতেই শোবার ব্যবস্থা
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ‘রিলাক্স রো’ চালু করছে, যেখানে তিনটি সিট একসঙ্গে বুক করে সেটিকে বিছানায় রূপান্তর করা যাবে। যাত্রীদের দেওয়া হবে ম্যাট্রেস, বালিশ ও কম্বল।
বাঙ্ক বেড: দীর্ঘ যাত্রায় আরাম
এয়ার নিউজিল্যান্ড নিয়ে আসছে ‘স্কাইনেস্ট’। ইকোনমি যাত্রীদের জন্য বাঙ্ক বেড ব্যবস্থা। ছয়টি ঘুমানোর পড থাকবে, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বুক করা যাবে। দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে এটি যাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।
আরও লেগরুম, আরও স্বাচ্ছন্দ্য
ইজিজেট নতুন হালকা সিট চালু করছে, যা অতিরিক্ত লেগরুম দেবে। এতে যাত্রীরা হাঁটু ও পায়ের জন্য বেশি জায়গা পাবেন।
আকাশেও ইন্টারনেট: স্টারলিংক সংযোগ
স্টারলিংক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিমানে উচ্চগতির ইন্টারনেট চালু হচ্ছে। এতে যাত্রীরা পুরো ভ্রমণজুড়ে অনলাইনে থাকতে পারবেন।
ইউরোপে প্রথম এই সেবা চালু করে এয়ারবাল্টিক। পরে এয়ার ফ্রান্স এবং এসএএস’ও এই প্রযুক্তি যুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বিমান ভ্রমণ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা। কাজ, বিশ্রাম, বিনোদন— সব কিছুই মিলবে একসঙ্গে। সব মিলিয়ে, আকাশপথে ভ্রমণের ধারণাই বদলে যেতে চলেছে, যেখানে যাত্রীই হবে কেন্দ্রবিন্দু।