দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম দুর্গম ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ভুটান এখন বড় পরিবর্তনের পথে। নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি প্রকল্প দেশটিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আরও সহজলভ্য করে তুলতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক দক্ষিণাঞ্চলের গেলেফু শহরে নতুন একটি বিমানবন্দর নির্মাণকাজের উদ্বোধনে অংশ নেন।
বিবিসি লিখেছে, ভারত সীমান্তের কাছাকাছি জঙ্গলে ঘেরা এলাকায় ১২ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে তিনি নিজ হাতে গাছ কাটেন ও জমি পরিষ্কার করেন, যা ভবিষ্যতে ভুটানের পর্যটন খাতের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৯ সালে চালু, লক্ষ্য আন্তর্জাতিক হাব
২০২৯ সালে চালু হওয়ার কথা থাকা গেলেফু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ফেস্টিভ্যালে “ফিউচার প্রজেক্ট অব দ্য ইয়ার” পুরস্কার জিতেছে। ভুটানের নিজস্ব কাঠ দিয়ে নির্মিত এই বিমানবন্দরের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিকভাবেই আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।
এখানে থাকবে যোগ, মেডিটেশন এবং এমনকি ‘গং বাথ’-এর মতো আধ্যাত্মিক সুবিধা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিদিন ১২৩টি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে এটি ভুটানের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
নতুন শহর: গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি
এই বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ (জিএমসি)। একটি বিশেষ এই প্রশাসনিক অঞ্চলে ২০৬০ সালের মধ্যে ১০ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারে বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
এই শহর হবে ব্যবসা, বিনিয়োগ, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিশ্রণ।
ভুটানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং বলেন, “এই প্রকল্প নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও যাত্রী।”
সীমিত পর্যটন নীতি, তবু পরিবর্তনের আভাস
ভুটান দীর্ঘদিন ধরে “হাই ভ্যালু, লো ভলিউম” নীতিতে পর্যটন পরিচালনা করে আসছে। ১৯৭৪ সালে পর্যটকদের জন্য দেশটি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট ফি দিয়ে সীমিত সংখ্যক পর্যটক প্রবেশ করতে পারেন।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রতি পর্যটকের জন্য ১০০ ডলার ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি’ দিতে হয়। নতুন বিমানবন্দর চালু হলেও এই নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নীতি বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।
কঠিন যাত্রাপথের অবসান?
এখন পর্যন্ত ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পারো, যেখানে প্রতিদিন মাত্র কয়েকটি ফ্লাইট ওঠানামা করে। দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিমানবন্দরগুলোর একটি। মাত্র অল্পসংখ্যক পাইলটই এখানে অবতরণ করতে পারেন।
ফলে ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে ভুটানে পৌঁছাতে যাত্রীদের ব্যাংকক, কাঠমান্ডু বা দিল্লি হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। নতুন বিমানবন্দর চালু হলে এই জটিলতা অনেকটাই কমবে।
দক্ষিণ ভুটান: নতুন পর্যটন গন্তব্য
নতুন বিমানবন্দর চালু হলে ভুটানের দক্ষিণাঞ্চল খুলে যাবে, যা এখনো পর্যটকদের কাছে প্রায় অজানা। অঞ্চলটি উপক্রান্তীয় বন, নদী, কমলা ও এলাচের বাগান এবং উষ্ণ প্রস্রবণের জন্য পরিচিত।
গেলেফুর পাশে রয়েছে রয়্যাল মানাস ন্যাশনাল পার্কসহ দুটি জাতীয় উদ্যান। এখানে বাঘ, হাতি, গণ্ডার, গোল্ডেন ল্যাঙ্গুরসহ অসংখ্য বিরল প্রাণী এবং ৩৬০টির বেশি প্রজাতির পাখি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল।
নতুন অভিজ্ঞতা: জঙ্গল, ট্রেইল ও হোমস্টে
ভুটানের নতুন পর্যটন পরিকল্পনায় বিলাসবহুল হোটেলের পাশাপাশি থাকবে হোমস্টে ও ইকো-ক্যাম্প। পর্যটকরা জঙ্গল সাফারি, রাফটিং, পাখি দেখা এবং ফ্লাই ফিশিংয়ের মতো অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।
২০২৮ সালে চালু হতে যাওয়া ১৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘লোটাস-বর্ন ট্রেইল’ পর্যটকদের দক্ষিণের জঙ্গল থেকে পাহাড়ি আধ্যাত্মিক অঞ্চলে নিয়ে যাবে—যা আট দিনের এক অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
সংস্কৃতি ও খাবারের নতুন কেন্দ্র
গেলেফুর পুরোনো শহর পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও চলছে। এখানে দক্ষিণ ভুটানের বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবার—যেমন থালি, ডাল এবং ভুটানের বিখ্যাত ‘এমা দাতশি’—পর্যটকদের আকর্ষণ করবে।
একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, দেয়ালচিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
ভবিষ্যতের পথে ভুটান
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প শুধু ভুটানে পর্যটন সহজ করবে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনবে।
রাজা ওয়াংচুক বলেন, “নতুন কিছু করার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। আমরা চাই, এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক।”
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের নিভৃত ও নিয়ন্ত্রিত ভুটান এখন ধীরে ধীরে বিশ্বমুখী হচ্ছে, তবে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখেই।