চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ অর্থাৎ আগামী ৮০ বছরের মধ্যে বিশ্বের বেশ কিছু পর্যটন গন্তব্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের মতে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৭ থেকে ৩৩ ইঞ্চি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে টোকিও বা নিউ অরলিন্সের মতো বড় শহরগুলো ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়লেও মালদ্বীপ, ফিজি বা সেশেলসের মতো নিচু দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, 'হারিয়ে যাওয়ার আগে দেখে নিই'—এই মানসিকতা উল্টো এই গন্তব্যগুলোর ক্ষতি ত্বরান্বিত করছে। অতিরিক্ত বিমান চলাচল এবং পর্যটকদের ভিড় কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং স্থানীয় অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে বলে ডেইলি মেইলের প্রতিবদেনে বলা হয়েছে।
নিচে বিপন্ন গন্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
১. মালদ্বীপ
ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপমালাটি বিশ্বের সবচেয়ে নিচু দেশ। এর গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ দশমিক ৫ মিটার। সমুদ্রের উচ্চতা এভাবে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে মালদ্বীপের ১১০০টি দ্বীপের প্রায় ৮০ শতাংশই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বর্তমানে এখানে ৫ লাখের বেশি মানুষের বাস, যাদের বড় অংশই রাজধানী মালেতে ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকছেন।
২. কিরিবাতী
প্রশান্ত মহাসাগরের এই দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এখানে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে চারগুণ বেশি (বছরে প্রায় ১.২ সেন্টিমিটার)। এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই দেশটি হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
৩. বাহামা দ্বীপপুঞ্জ
ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দেশটির রাজধানী নাসাউ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫ মিটার উঁচুতে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানচিত্র অনুযায়ী, আগামী ৭৫ বছরের মধ্যে এর বিশাল অংশ তলিয়ে যেতে পারে। এখানকার চুনাপাথরের ভূ-প্রকৃতির কারণে সমুদ্রের পানি কেবল উপকূল দিয়ে নয়, বরং মাটির নিচ দিয়েও উঠে এসে জনপদ প্লাবিত করছে।
৪. ফিজি
সাদা বালুর সৈকত আর আগ্নেয় পাহাড়ের এই স্বর্গরাজ্যটি কেবল সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি নয়, বরং চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণেও ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০০৯ সালের ভয়াবহ বন্যায় এখানে বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং পর্যটন ও চিনি শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
৫. সামোয়া
নিউজিল্যান্ড থেকে স্বাধীন হওয়া এই দেশটি পর্যটনের চাপে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে এখানকার প্রবাল প্রাচীরগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই প্রাচীরগুলো প্রাকৃতিকভাবে ঢেউ প্রতিরোধ করে; এগুলো না থাকলে উপকূলীয় ভাঙন ও বন্যা আরও তীব্র হবে।
৬. সেশেলস
ভারত মহাসাগরের ১১৫টি দ্বীপের এই দেশটি বিলাসবহুল পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। এখানকার ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের অধিকাংশ এবং মূল অবকাঠামো উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে এই দেশটির বড় অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৭. টুভালু
বিগত ৩০ বছরে এখানে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ২১ সেন্টিমিটার, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ। জাতিসংঘের মতে, ২১০০ সালের মধ্যে টুভালুর ৯৫ শতাংশ ভূখণ্ড তলিয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে এই দেশটির ভূমিকা নগণ্য হলেও এর পরিণতি তাদের সবচেয়ে ভয়াবহভাবে ভোগ করতে হচ্ছে।
৮. মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ
মাত্র ১৮১ বর্গকিলোমিটারের এই দেশটিতে সমুদ্রের আগ্রাসন বর্তমানে দৃশ্যমান। রাজধানী মাজুরো-র অনেক জমি যা আগে চাষযোগ্য বা বসবাসের উপযোগী ছিল, তা এখন সমুদ্রের পেটে চলে গেছে। এটি কোনো দূরবর্তী সম্ভাবনা নয়, বরং বর্তমানে ঘটে চলা বাস্তব চিত্র।
৯. ভানুয়াতু
বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ এই দেশটিতে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ অনেক বেশি। ২০১৫ সালের ঘূর্ণিঝড় 'প্যাম' দেশটির রাজধানী পোর্ট ভিলার ৯০ শতাংশ ভবন ধ্বংস করে দিয়েছিল। চরম আবহাওয়া দেশটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
১০. বাংলাদেশ
২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১.৫ মিটার বাড়লে বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ হারাতে পারে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সমুদ্রের লোনা পানি কৃষি জমিতে ঢুকে পড়ায় চাষাবাদ অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা মানুষকে বাধ্য করছে শহরমুখী হতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে।
এই ১০ গন্তব্য ছাড়াও সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার বা মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে আরও সাতটি জনপ্রিয় স্থান। এ তালিকায় রয়েছে—
১১. ইতালির ভেনিস (বিখ্যাত 'ভাসমান শহর' যা বছরে ১ থেকে ২ মিলিমিটার করে তলিয়ে যাচ্ছে)।
১২. পালাউ (প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ যার উপকূলরেখা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে)।
১৩. টরিস স্ট্রেট দ্বীপপুঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির মধ্যবর্তী স্থান, যেখানে সমুদ্রের লোনা পানি মাছ ও সামুদ্রিক সম্পদ ধ্বংস করছে)।
১৪. সলোমন দ্বীপপুঞ্জ (ইতিমধ্যেই এখানকার বেশ কিছু ছোট দ্বীপ সমুদ্রতলে বিলীন হয়ে গেছে)।
১৫. নেদারল্যান্ডস (দেশের ২৫ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটার বাড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে)।
১৬. মিয়ামি, যুক্তরাষ্ট্র (ফ্লোরিডার এই শহরটি নিচু এবং ছিদ্রযুক্ত চুনাপাথরের ওপর অবস্থিত হওয়ায় মাটির নিচ থেকে পানি উঠে আসার ঝুঁকিতে আছে)।
১৭. নাউরু (ক্ষুদ্র এই দ্বীপরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ জমি খনিজ উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত, যা সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আরও অরক্ষিত হয়ে পড়েছে)।