প্রকৃতির বিস্ময়, ইতিহাসের গৌরব আর স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য মিলিয়ে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন শহর ও পর্যটনকেন্দ্র। কোথাও আগ্নেয়গিরির দ্বীপ, কোথাও ঝুলন্ত সেতু, কোথাও আবার হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এসব জায়গা শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, বরং নতুন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার এক অনন্য সুযোগ। বিশ্বের এমনই কয়েকটি বিখ্যাত ও বিস্ময়কর গন্তব্য নিয়ে এই আয়োজন।
গ্রিসের সান্তরিনি
ইজিয়ান সাগরের বুকে অবস্থিত গ্রিসের জনপ্রিয় দ্বীপ সান্তরিনি বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। লক্ষাধিক বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে দ্বীপটির সৃষ্টি হয়। সাদা রঙের ঘর, নীল গম্বুজ আর সমুদ্রঘেরা পাহাড়ি সৌন্দর্যের জন্য এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
গ্রিসের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত সান্তরিনি এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পর্যটকে মুখর থাকে।
কানাডার ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সবুজ বনভূমির মধ্যে অবস্থিত ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ পর্যটকদের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ১৮৮৯ সালে নির্মিত ১৪০ মিটার দীর্ঘ এই ঝুলন্ত সেতু কাপিলানো নদীর ওপর প্রায় ৭০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে।
সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটার সময় দুলতে থাকা কাঠামো অনেকের কাছেই রোমাঞ্চ আর ভয় দুই অনুভূতিই তৈরি করে।
জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলপ্রপাত ভিক্টোরিয়া ফলস জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়ার সীমান্তে জাম্বেজি নদীর ওপর অবস্থিত। প্রায় ১০৮ মিটার উঁচু এবং ১ হাজার ৭০৩ মিটার প্রশস্ত এই জলপ্রপাত থেকে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ পানি নিচে পড়ে।
জলপ্রপাতের পানি থেকে তৈরি কুয়াশা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যায়। স্থানীয়রা একে ‘দ্য স্মোক দ্যাট থান্ডার্স’ বলেও অভিহিত করেন।
ইতালির ভেনিস
জলপথনির্ভর শহর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ইতালির ভেনিস। খাল, সেতু আর গন্ডোলার শহরটি প্রতিবছর কোটি কোটি পর্যটককে আকর্ষণ করে।
উত্তর-পূর্ব ইতালির ভেনেতো অঞ্চলে অবস্থিত ভেনিসে রয়েছে প্রায় ১১৮টি ছোট দ্বীপ। শহরটির বেশিরভাগ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় নৌপথে ভ্রমণের মাধ্যমে।
ইতালির রোম
হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শহর রোমকে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র বলা হয়। কলোসিয়াম, রোমান ফোরাম কিংবা ভ্যাটিকানের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা এই শহরকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
প্রাচীন রোমান সভ্যতার নিদর্শন আর শিল্প-সংস্কৃতির জন্য রোম এখনো বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নগরী।
বেলিজের গ্রেট ব্লু হোল
মধ্য আমেরিকার দেশ বেলিজে অবস্থিত গ্রেট ব্লু হোল বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ডাইভিং স্পট। বিশাল এই ডুবো সিঙ্কহোলের গভীরতা প্রায় ৪০৭ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৯৮৪ ফুট।
নীল বৃত্তাকার গঠন আর সমুদ্রের রহস্যময় পরিবেশের কারণে এটি বিশ্বজুড়ে পর্যটক ও ডাইভারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
চীনের রেড বিচ
চীনের পানজিন অঞ্চলে অবস্থিত রেড বিচ প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। সৈকতের পানি নয়, বরং সুইডা নামের এক ধরনের শৈবালের কারণে পুরো এলাকা লাল আভা ধারণ করে।
এখানে রয়েছে শত শত প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি অনন্য এক গন্তব্য।
চীনের মহাপ্রাচীর
বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম চীনের মহাপ্রাচীর মানবসৃষ্ট সবচেয়ে বড় স্থাপনাগুলোর একটি। উত্তর দিকের আক্রমণ ঠেকাতে কয়েক শতাব্দী ধরে এটি নির্মাণ করা হয়।
প্রাচীরটির কিছু অংশ এতটাই প্রশস্ত যে একসঙ্গে একাধিক ঘোড়া চলতে পারে বলে প্রচলিত আছে।
পেরুর মাচুপিচু
আন্দিজ পর্বতমালার উচ্চভূমিতে অবস্থিত ইনকা সভ্যতার নিদর্শন মাচুপিচু বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় প্রত্নস্থান। ১৫শ শতকে নির্মিত শহরটি স্প্যানিশ আক্রমণের পরও দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল।
বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই স্থান পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
তিব্বতের পোটালা প্যালেস
দালাই লামার ঐতিহাসিক বাসভবন হিসেবে পরিচিত পোটালা প্যালেস বিশ্বের উচ্চতম রাজপ্রাসাদগুলোর একটি। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় নির্মিত এই প্রাসাদে রয়েছে প্রায় এক হাজার কক্ষ।
তিব্বতের সংস্কৃতি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এটি।
ভারতের তাজমহল
ভারতের আগ্রায় অবস্থিত তাজমহল প্রেম ও স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করেন।
সাদা মার্বেলের এই সৌধ বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত।
ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লাস বিচ
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত গ্লাস বিচ সাধারণ সৈকতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বালুর পরিবর্তে দেখা যায় অসংখ্য রঙিন কাচের টুকরো, যা সময়ের সঙ্গে সমুদ্রের পানিতে মসৃণ হয়ে গেছে।
সূর্যের আলো পড়লে পুরো সৈকত ঝলমলে রঙে ভরে ওঠে।
অ্যান্টার্কটিকা
পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত অ্যান্টার্কটিকা বিশ্বের সবচেয়ে শীতল মহাদেশ। প্রায় পুরো অঞ্চলই বরফে ঢাকা।
পেঙ্গুইন, তিমি, সিলসহ নানা সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল এই মহাদেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল
এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত ইস্তাম্বুল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অনন্য শহর। অটোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য বহনকারী এই নগরীতে রয়েছে মসজিদ, প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক বাজার।
বসফরাস প্রণালীর দুই তীরে বিস্তৃত শহরটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
স্পেনের বার্সেলোনা
ভূমধ্যসাগর তীরের শহর বার্সেলোনা শিল্প, স্থাপত্য ও ফুটবলের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। আন্তোনি গাউদির নকশায় তৈরি অসাধারণ স্থাপনাগুলো শহরটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
শহরটির সৈকত, পাহাড়ি দৃশ্য আর ঐতিহাসিক নিদর্শন পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি
সিডনি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় উপকূলীয় শহর। সিডনি অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ, সমুদ্রসৈকত ও ওয়াটার স্পোর্টসের জন্য শহরটি পরিচিত।
পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও উপভোগ্য গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত।
অস্ট্রেলিয়ার হিলার লেক
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিডল আইল্যান্ডে অবস্থিত হিলার লেকের পানির রং গোলাপি। প্রাকৃতিক এই বিস্ময় বিজ্ঞানীদের কাছেও কৌতূহলের বিষয়।
আকাশ থেকে দেখলে গোলাপি হ্রদটির সৌন্দর্য আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
ফরাসি পলিনেশিয়ার বোরা বোরা
নীল জলরাশি, প্রবালপ্রাচীর আর আগ্নেয়গিরিময় ভূপ্রকৃতির জন্য বোরা বোরা দ্বীপপুঞ্জ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিলাসবহুল রিসোর্ট ও শান্ত পরিবেশের কারণে এটি হানিমুন গন্তব্য হিসেবেও জনপ্রিয়।
ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা
বিশ্বের বৃহত্তম চার্চগুলোর একটি সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা রেনেসাঁ স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ। প্রতি বছর লাখো পর্যটক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ভ্রমণ করেন।
ইথিওপিয়ার গ্রেট রিফট ভ্যালি
প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত গ্রেট রিফট ভ্যালি পৃথিবীর বৃহত্তম ভূতাত্ত্বিক ফাটলগুলোর একটি। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই উপত্যকা প্রকৃতি ও ভূতত্ত্ব গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।