ভারতের গভীর জঙ্গলে জিপে বসে রাজকীয় বাঘের দেখা পাওয়া পর্যটকদের জন্য এক স্বপ্নাতুর অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে গিয়ে হাতে ধরা মোবাইল ফোনটিই এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ে দেশটির বেশ কয়েকটি টাইগার রিজার্ভে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা এবং পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কথা মাথায় রেখেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত।

‘সাফারি জ্যাম’: বাঘ যখন পর্যটকের খাঁচায়
সম্প্রতি রাজস্থানের রণথম্ভোর ন্যাশনাল পার্কের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা বন্যপ্রাণী প্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বাঘকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে একাধিক সাফারি জিপ। পর্যটকদের চিৎকার এবং ছবি তোলার হিড়িকে বাঘটি স্পষ্টতই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা “সাফারি জ্যাম” হিসেবে অভিহিত করছেন, যা বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭৫ শতাংশই ভারতে বাস করে। জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কসহ দেশের ৫৮টি রিজার্ভে বর্তমানে ৩,৬০০টির বেশি বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।
কেন মোবাইল ফোনকে ‘হুমকি’ মনে করা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের পর্যটন শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী দর্শনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সামাজিক মাধ্যমে জাহির করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

ভারতীয় সাংবাদিক চারুকেশী রামাদুরাই বলেন, ‘ছবি তুলতে গিয়ে পর্যটকরা অবিশ্বাস্যভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন। কখনও সেলফি তুলতে গিয়ে শিশু গাড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছে, আবার কখনও ফোন পড়ে যাওয়ায় গাইডদের বিপদের মুখে নামতে হচ্ছে।’
সাফারি অপারেটর শরদ কুমার ভাতস জানান, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারও বন্যপ্রাণীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ বা জিওট্যাগিংয়ের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বাঘের অবস্থান ছড়িয়ে পড়ায় বনের নির্দিষ্ট এক জায়গায় শত শত পর্যটক ভিড় করছেন, যা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে।
সংরক্ষণ বনাম পর্যটন: অগ্রাধিকার কোনটি?
নতুন এই আইনের মূল বার্তা খুব স্পষ্ট— সংরক্ষণই সবার আগে।

মুম্বাইভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ঋতু মাখিজা বলেন, ‘নীতিটি পরিষ্কার; বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে পর্যটন ব্যবস্থার ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে।’
আদালতের নির্দেশে শুধু মোবাইল নিষিদ্ধই নয়, আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে-
>> রাতের সাফারি সম্পূর্ণ বন্ধ।
>> সংরক্ষিত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন সীমিত করা।
>> স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে টেকসই পর্যটনের প্রসার।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি: একা নয় ভারত
প্রকৃতি রক্ষায় ভারতের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক ধারারই অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন পর্যটকদের নিয়ন্ত্রিত আচরণের ওপর জোর দিচ্ছে। যেমন-
>> কেনিয়ায় পর্যটকদের আচরণে কঠোর বিধিমালা আরোপ করা হয়েছে।
>> নরওয়ের স্বালবার্ডে মেরু ভালুক থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
>> শ্রীলঙ্কায় বন্যপ্রাণী এলাকায় অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালার কথা উঠেছে।
পর্যটকদের মানসিকতা বদলানোর ডাক
অভিজ্ঞ পর্যটক প্রাচী যোশীর মতে, সাফারির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাঘ দেখার উন্মাদনা নয়, বরং পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানকে উপভোগ করা। 
কেনিয়ার গাইড জারেক কোকার মনে করেন, একটি ‘পারফেক্ট শট’ বা নিখুঁত ছবির নেশা পর্যটকদের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তুলছে।