ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় জেট ফুয়েলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা সামনের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে বিমানভাড়া বৃদ্ধি ও ফ্লাইট বাতিলের ঝুঁকি তৈরি করছে।
‘ছয় সপ্তাহের মজুত’
আইইএ প্রধানের সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিচালক ফাতিহ বিরল সতর্ক করেছেন, ইউরোপে হয়তো আর ছয় সপ্তাহের মতো জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য “সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট” হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ সম্ভাব্য জ্বালানি ঘাটতির মূল্যায়নকে “উদ্বেগজনক” বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, মে মাসের শেষ নাগাদ ইউরোপে জ্বালানি সংকটে ফ্লাইট বাতিল শুরু হতে পারে, যা এশিয়ার কিছু অংশে যা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে জেট জ্বালানির দাম
জেট ফুয়েল মূলত অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি কেরোসিনভিত্তিক পরিশোধিত পণ্য। এটি বিমান সংস্থাগুলোর মোট ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ জুড়ে থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর দাম দ্বিগুণ হওয়ায় এ ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেছে। পর্যটন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ট্যুরিজম ইকোনমিকস জানায়, মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৪ শতাংশ বেড়েছে—যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় অস্থিরতা। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানভাড়া ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কোন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের বরাতে ইউরো নিউজ লিখেছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জেট জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, এরপর ইউরোপ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইউরোপের প্রায় ৪০ শতাংশ জেট ফুয়েল আমদানি হতো, যা যুদ্ধের পর থেকে বন্ধ। যুক্তরাষ্ট্র কিছু ঘাটতি পূরণে ইউরোপে রপ্তানি বাড়ালেও পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। সতর্ক করা হয়েছে, যদি মজুত ২৩ দিনের নিচে নেমে যায়, তবে কিছু বিমানবন্দরে বাস্তব ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
যাত্রীদের কী প্রভাব পড়বে?
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার অ্যান্ডারসন বলেছেন, বিষয়টি এখন শুধু জ্বালানির দামের নয়, বরং পুরো ফ্লাইট নেটওয়ার্ক পরিকল্পনার প্রশ্ন।
যাত্রীরা যেসব পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন—
• বিমানভাড়া বৃদ্ধি
• কম স্বল্পমূল্যের টিকিট
• সময়সূচিতে ঘন ঘন পরিবর্তন
• বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার বিশেষ করে ইউরোপ-এশিয়া রুটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উত্তর আমেরিকা-এশিয়া রুটের ১০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলাচল করে—যা এখন ঝুঁকিতে।
বিমান সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ
ডাচ বিমান সংস্থা কেএলএম আগামী মাসে ১৬০টি ফ্লাইট কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। জার্মানির লুফথানসা উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে তাদের সহযোগী সিটি লাইন বন্ধ করছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন এসএএস এপ্রিল মাসে অন্তত এক হাজার ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা এয়ার লাইনস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখলেও তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব আশা করছে না। তবে বিভিন্ন মার্কিন বিমান সংস্থা ইতোমধ্যে চেকড ব্যাগেজ ফি বাড়িয়েছে। এদিকে হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক জ্বালানি সারচার্জ প্রায় ৩৪ শতাংশ বাড়িয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া কিছু রুটে অতিরিক্ত ২৮০ ডলার পর্যন্ত ফি যুক্ত করেছে।
সামনে কী
বিশ্ব প্রতিদিন ১ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হারাচ্ছে বলে বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। যদিও জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাজারে পুরোপুরি সরবরাহ ফিরতে বছরের শেষ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—গ্রীষ্ম মৌসুমে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে আগেভাগে টিকিট নিশ্চিত করা এবং ভাড়ার ওঠানামার জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বিমান ভ্রমণে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।