একটি নির্জন দ্বীপ; চারদিকে নীল জলরাশি; নেই শহরের কোলাহল, নেই অফিসের চাপ। এমন নিঃসঙ্গ দ্বীপে সময় কাটানোর স্বপ্ন বহু ভ্রমণপ্রেমীর। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্বপ্নের সেই ‘একাকিত্ব’ অনেকেই সামাল দিতে পারছেন না।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, সম্প্রতি একদল পর্যটক ‘ডেজার্ট আইল্যান্ড সারভাইভাল’ নামে একটি ভ্রমণে অংশ নেন। পরিকল্পনা ছিল, এক সপ্তাহ জনমানবহীন এক উষ্ণমণ্ডলীয় দ্বীপে থাকা। সঙ্গে থাকবে শুধু একটি ছুরি, মাছ ধরার সুতা এবং কয়েকজন সহযাত্রী। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্ধারের আবেদন জানান।
অর্থাৎ, স্বপ্নের নির্জনতা বাস্তবে পরিণত হয়েছিল অসহনীয় চাপে।

প্রকৃতির কাছাকাছি, কিন্তু অস্বস্তিতে
শুধু সারভাইভাল চ্যালেঞ্জ নয়, বিলাসবহুল রিমোট রিসোর্টেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ট্যুর অপারেটর আ’আরু কালেক্টিভের প্রধান কেলি ফোর্বস জানান, অনেক অতিথিই প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ সামাল দিতে পারছেন না।
সেশেলসে এক অতিথি অভিযোগ করেছেন, ভোরে পাখির ডাক তার ঘুম ভেঙে দেয়। মালদ্বীপে এক ভ্রমণকারীর ভাষ্য, ওভার-ওয়াটার বাংলোটি সমুদ্রের খুব কাছে, ঢেউয়ের শব্দে ঘুমাতে পারছেন না। কেনিয়ার এক সাফারি ক্যাম্পে আবার এক অতিথি অভিযোগ করেন, একটি জলহস্তী তার তাঁবুর পাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল।
অর্থাৎ, যা কারও কাছে রোমাঞ্চকর, অন্য কারও কাছে তা হয়ে যাচ্ছে বাড়াবাড়ি।

নীরবতাও অসহনীয়?
সুইডিশ ল্যাপল্যান্ডের কালিক্সে স্কগ অরোরা ইগলুতে এক অতিথি জানান, নীরবতা এতটাই গভীর যে কানে যেন শব্দ বাজছিল। শহুরে পটভূমির শব্দে অভ্যস্ত মানুষ হঠাৎ সম্পূর্ণ নীরবতায় ঘুমাতে পারছেন না।
থাইল্যান্ডের এক প্রাইমারি ফরেস্টে অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব রিসোর্টে অতিথিরা রাতে ব্যাঙের ডাক বন্ধ করতে পরিচর্যা কর্মীদের বাইরে গিয়ে সেগুলো সরানোর অনুরোধও করেছেন।

অফ-গ্রিড ভ্রমণের ট্রেন্ড, কিন্তু প্রস্তুতি কোথায়?
২০২৬ সালের ভ্রমণ ট্রেন্ড রিপোর্টে ‘স্পেস অ্যান্ড সেরেনিটি’ বা নির্জনতা ও প্রশান্তিকে বড় প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘ডিসকানেকশন’ এখন বিলাসিতার নতুন সংজ্ঞা। অফ-গ্রিড বা প্রযুক্তিবিচ্ছিন্ন ভ্রমণের চাহিদাও বাড়ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটকরা কি এজন্য সত্যিই প্রস্তুত?
ডেজার্ট আইল্যান্ড সারভাইভালের প্রতিষ্ঠাতা টম উইলিয়ামসের মতে, আধুনিক মানুষ আর অস্বস্তিতে অভ্যস্ত নয়। আরাম-আয়েশের জীবনে আমরা প্রতিকূলতা সামলানোর ক্ষমতা হারাচ্ছি। যদিও তিনি বলেন, প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে পারলে আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা ও কৃতজ্ঞতা— সবই বাড়ে।

‘ছুটির আমি’ বনাম ‘বাস্তব আমি’
ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পরিবেশমনোবিজ্ঞানী ড. সোনিয়া হাউস্টেইন বলেন, সমস্যাটি শুধু প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফারাক নয়; বরং আমাদের কল্পিত সত্তা আর প্রকৃত সত্তার দ্বন্দ্বও।
ভ্রমণে আমরা নিজেদের ‘আদর্শ সংস্করণ’ হতে চাই— শান্ত, সাহসী, প্রকৃতিপ্রেমী। কিন্তু বাস্তবে হয়তো আমরা ততটা প্রস্তুত নই।

সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গলের দোলনায় দোল খাওয়ার ছবি দেখা যায়, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর বাস্তবতা দেখা যায় না। অনলাইনে পরিকল্পিত ভ্রমণে প্রেক্ষাপটের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে গন্তব্যে পৌঁছে অভিজ্ঞতাটি শরীর-মন— দুদিক থেকেই ভিন্ন মনে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্তব্য নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা, নিজের প্রত্যাশা যাচাই এবং প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ ট্রাভেল অ্যাডভাইজরের পরামর্শ নেওয়া হতাশা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

রিমোট ভ্রমণ কি তবে অর্থহীন?
একেবারেই নয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ফিনল্যান্ডে জনস্বাস্থ্য নির্দেশিকায় মাসে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা প্রকৃতির মাঝে থাকার সুপারিশ করা হয়।
প্রশ্ন একটাই— আমরা কি সত্যিই সেই নীরবতা, অস্বস্তি এবং প্রকৃতির অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করার মতো মানসিকভাবে প্রস্তুত?
রিমোট ভ্রমণ রোমান্টিক হতে পারে। কিন্তু সেটি উপভোগ করতে চাই প্রস্তুতি, আত্মজ্ঞান এবং বাস্তব প্রত্যাশা।
নইলে স্বপ্নের নির্জনতাও হয়ে উঠতে পারে ‘অতিরিক্ত সামলানোর’ অভিজ্ঞতা।