বাংলা নববর্ষের উচ্ছ্বাস না কাটতেই কক্সবাজারে ছড়িয়ে পড়েছে আরেক উৎসবের আমেজ। রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাইন জলকেলিতে মুখর হয়ে উঠেছে পর্যটন নগরী। পুরোনো বছরের গ্লানি ধুয়ে নতুনকে বরণ করতে বর্ণিল আয়োজনে মেতে উঠেছে রাখাইন পল্লি ও শহরের নানা এলাকা।
রাখাইন পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৬ এপ্রিল শেষ হয় ১৩৮৭ বর্ষ, ১৭ এপ্রিল শুরু হয় নতুন বর্ষ ১৩৮৮। সেই উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুসারে ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। প্রথম কয়েকদিন বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার পালনের পর নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে শুরু হয় তিন দিনের জলকেলি, যা রোববার শেষ হবে।
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক মং ছেন হ্লা রাখাইন জানান, উৎসবের সকালে রাখাইন পল্লিগুলো থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। শিশু-কিশোররা মাটির কলস আর প্রবীণরা কল্পতরু বহন করে বৌদ্ধ বিহারে যান। ধর্মীয় আচার শেষে বিকেলে শুরু হয় জলকেলির মূল আয়োজন।
প্রতিটি প্যান্ডেল ফুল ও রঙিন কাগজে সাজানো হয়েছে। মাঝখানে পানিভর্তি ড্রাম ঘিরে দুই পাশে অবস্থান নেন তরুণ-তরুণীরা। বাদ্যযন্ত্রের তালে নাচ-গানের মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের দিকে ছিটান ‘মঙ্গল জল’। বিশ্বাস করা হয়, এই জল পুরোনো বছরের দুঃখ, কষ্ট ও অশুভ শক্তি দূর করে নতুন বছরের জন্য শুভ সূচনা আনে।
এবার জেলায় প্রায় ৩৭টি প্যান্ডেলে উৎসব হচ্ছে। শহরের পূর্ব-পশ্চিম মাছ বাজার, ফুলবাগ সড়ক, ক্যাংপাড়া, হাঙরপাড়া, টেকপাড়া, বার্মিজ স্কুল রোড, বৌদ্ধ মন্দির সড়ক ও চাউল বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় আয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালী, টেকনাফ, চকরিয়া, হারবাং, রামু ও চৌফলদন্ডীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক প্যান্ডেলে চলছে জলকেলি।
রাখাইন পল্লিগুলোতে দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত তরুণীরা পানিভর্তি ড্রামের পাশে অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দল বেঁধে প্যান্ডেলে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। প্যান্ডেলে পৌঁছেই শুরু হয় পানি ছিটানোর আনন্দঘন পর্ব, যা পরিণত হয় প্রাণবন্ত সামাজিক মিলনমেলায়।
কক্সবাজার সরকারি সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ক্যা থিং অং বলেন, এটি রাখাইনদের নিজস্ব সামাজিক উৎসব। জল এখানে পবিত্রতা ও শুভ্রতার প্রতীক। পুরোনো বছরের সব গ্লানি ভুলে নতুনকে বরণ করার এক অনন্য আয়োজন এটি। প্রতি বছরই সব ধর্মের মানুষ এতে অংশ নেন, যা সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার জানান, উৎসবকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্যান্ডেলে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি চলছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব শেষ হবে বলে আশা করছে প্রশাসন।