ভ্রমণের গন্তব্য ঠিক করতে অনেকেই এখন নক্ষত্রের দিকে তাকাচ্ছেন। জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি শাখা—অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফি, যা জন্মছককে পৃথিবীর মানচিত্রের ওপর বসিয়ে দেখায়, কোন ভূখণ্ড আপনার জন্য প্রেম, সৌভাগ্য, কর্মউদ্যম বা মানসিক পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সেটিই ধীরে ধীরে ভ্রমণ পরিকল্পনার এক জনপ্রিয় মানদণ্ড হয়ে উঠছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তারাভিত্তিক ট্রিপ প্ল্যানিং
১৯৭০ এর দশকে বিকশিত এই ম্যাপিং পদ্ধতিতে জন্মের সময় গ্রহগুলোর অবস্থান বিশ্বমানচিত্রে প্রক্ষেপণ করা হয়। বিশ্বাসীরা মনে করেন, মানচিত্রে চিহ্নিত সেই রেখাগুলো ইঙ্গিত দেয়, কোথায় গেলে মিলতে পারে প্রেম, সৌভাগ্য, কর্মসাফল্য বা মানসিক পুনরুদ্ধার।
সম্প্রতি গুগল ট্রেন্ডসে অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। ২০২৫ সালে ক্রুজ কোম্পানি ‘রয়েল ক্যারিবিয়ান’ গ্রাহকদের ভ্রমণপথ বাছাইয়ে একজন পেশাদার অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফারের সহায়তা নিয়েছে। জানুয়ারিতে ‘লোনলি প্ল্যানেট’ সচেতন ভ্রমণপ্রত্যাশীদের জন্য ভ্রমণ-থিমযুক্ত ‘ট্যারোট ডেক’ প্রকাশ করেছে।
অবশ্য এটিকে বিজ্ঞান বলা যায় না। কিন্তু এক ক্রমশ অস্থির ও অনিশ্চিত পৃথিবীতে অনেকের কাছে এটি অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক মানসিক ভরসা।
মনোবিশেষজ্ঞ জোয়ানা উইলিয়ামসের মতে, “বিশ্ব যখন বিশৃঙ্খল মনে হয়, মানুষ তখন কোনো কাঠামো বা নিরাপদ নির্দেশনা খোঁজে।”
তিনি মনে করেন, ভ্রমণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—অসংখ্য হোটেল, ফ্লাইট ও গন্তব্যের ভিড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেয় এমন কোনো গাইডলাইন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়।
অর্থের মানচিত্র
অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফি মানচিত্র দেখতে কিছুটা পৃথিবীর ওপর আঁকা জটিল রেখার মতো। তবে ব্যবহার সহজ—আপনার জন্মতারিখ, সময় ও স্থান দিয়ে অনলাইন টুলে চার্ট তৈরি করা যায়। এরপর বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন কোন রেখা কী নির্দেশ করে।
বিশ্বাস অনুযায়ী-
• জুপিটার রেখা সংযোগ ও বিস্তৃতির প্রতীক—পরিবারভিত্তিক বা বহু-প্রজন্মের ভ্রমণে উপযোগী।
• মার্স রেখা সাহস ও কর্মশক্তির সঙ্গে যুক্ত—অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য আকর্ষণীয়।
• ভেনাস রেখা আনন্দ, সৌন্দর্য ও রোমান্সের প্রতীক—রোমান্টিক গেটঅ্যাওয়ে বা বন্ধুদের ট্রিপের জন্য জনপ্রিয়।
কেউ কেউ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মিল খুঁজে পান। লেখক জানান, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে তার ‘মার্স লাইন’ পড়েছে—যেখানে তরুণ বয়সে তিনি একা ব্যাকপ্যাকিং করেছিলেন। সেটিও কি নক্ষত্রের ইঙ্গিত?
ব্যবসায়িক কোচ কারেন জ্যাকসনের অভিজ্ঞতা আরও নাটকীয়। ক্যানসার সার্জারির পর স্পেনের মারবেলায় গিয়ে হঠাৎ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে ওঠেন—যা তার ‘সূর্য রেখা’র ওপর অবস্থিত। পরে গ্রিসের ন্যাক্সোসে, যেখানে তার ‘জুপিটার লাইন’ পড়ে, ছুটিতে থেকেও ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
আরেক জ্যোতিষী আমান্ডা ভস এখন যাযাবর জীবন বেছে নিয়েছেন—নিজের মানচিত্রের সহায়ক রেখাগুলোর শক্তি কাজে লাগাতে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো উপসাগর এলাকায় তার ‘মার্কিউরি’ ও ‘জুপিটার’ রেখা ছেদ করেছে—যা তার মতে কর্মজীবন ও বিকাশে সহায়ক।
ভ্রমণে নতুন অর্থের খোঁজ
অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফি বিজ্ঞান না হলেও, অনেকের কাছে এটি সিদ্ধান্তে আত্মবিশ্বাস যোগায়। আচরণ-বিশেষজ্ঞ পলা ফার্নের ভাষায়, “অনিশ্চয়তায় মানুষ কোনো না কোনো নোঙর খোঁজে। অ্যাস্ট্রোকার্টোগ্রাফি সেই মানসিক নোঙর হতে পারে।”
শেষ পর্যন্ত লেখক ট্যারোট কার্ড টেনে দেখেন—‘এইট অব পেন্টাকলস’, তাসমানিয়ার ডেলোরেইন। মানচিত্র মিলিয়ে দেখেন, সেখান দিয়ে তার ‘সূর্য উদয়’ রেখা গেছে—যা প্রাণশক্তি ও আনন্দের প্রতীক। তাহলে কি আবার অস্ট্রেলিয়া যাত্রার সময় হয়ে এসেছে?
ভ্রমণ কি কেবল মানচিত্রের পথ, নাকি নক্ষত্রেরও? উত্তর যাই হোক, অনেক ভ্রমণকারীর কাছে এখন গন্তব্য বাছাইয়ের আগে আকাশের দিকেও একবার তাকানো জরুরি হয়ে উঠছে।