তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণি, বিস্তীর্ণ উচ্চ মালভূমি আর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত তিব্বত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার মিটার ওপরে অবস্থিত এই অঞ্চল ভ্রমণে রয়েছে বিশেষ অনুমতি, কঠোর প্রশাসনিক বিধি এবং উচ্চতাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এই গন্তব্যে যাওয়া জটিল হতে পারে।
তিব্বত চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। রাজধানী লাসাসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে বিদেশি পর্যটকদের জন্য রয়েছে আলাদা নিয়মকানুন। পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিলে ভ্রমণ হতে পারে নিরাপদ ও স্মরণীয়।
বিশেষ অনুমতি বাধ্যতামূলক
তিব্বতে প্রবেশের জন্য চীনা সরকারের বিশেষ ভ্রমণ অনুমতিপত্র প্রয়োজন। অনুমোদিত ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে আবেদন করে এই অনুমতি সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশ থেকেও কয়েকটি সংস্থা তিব্বত ভ্রমণ প্যাকেজ পরিচালনা করে এবং তারা অনুমোদিত চীনা সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করে দেয়।
আগে নিতে হবে চীনের ভিসা
বিশেষ অনুমতি পাওয়ার আগে অবশ্যই চীনের পর্যটক ভিসা সংগ্রহ করতে হবে। ভিসার ধরন অনুযায়ী খরচ হতে পারে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার টাকা। সাধারণত এক সপ্তাহ সময় লাগে। ভিসা পাওয়ার পর পাসপোর্ট ও ভিসার অনুলিপি তিব্বতের সংস্থায় পাঠাতে হয়। অনুমতিপত্র পেতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে। সব মিলিয়ে অন্তত দেড় মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করা নিরাপদ।
সড়ক, রেল ও আকাশপথে যাত্রা
চীনের বিভিন্ন প্রদেশ হয়ে তিব্বতে যাওয়া যায়। আকাশপথ, রেলপথ ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ রয়েছে। সিচুয়ান প্রদেশের সিচুয়ান-তিব্বত মহাসড়ক চেংদু থেকে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে লাসায় পৌঁছেছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার রেলপথ হিসেবে পরিচিত ছিংহাই-তিব্বত রেলপথও জনপ্রিয়। বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ পর্যটক কুনমিং হয়ে তিব্বতে যান।
১০ দিন ৯ রাতের সম্ভাব্য ব্যয়
১০ দিন ৯ রাতের একটি দলীয় প্যাকেজে তিব্বত সফরের মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় লাখ টাকার সমান। এর মধ্যে থাকে তিব্বত ভ্রমণ অনুমতি, কুনমিং থেকে শিনিং পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রা, শিনিং থেকে লাসা পর্যন্ত রেলভ্রমণ, লাসা থেকে সড়কপথে এভারেস্ট বেজক্যাম্প যাত্রা, হোটেলে থাকা, নির্ধারিত খাবার এবং ফেরার বিমানভাড়া।
ঢাকা থেকে কুনমিং পর্যন্ত যাওয়া-আসার বিমানভাড়া আগেভাগে কিনলে কমে আসতে পারে। শিনিং থেকে লাসা পর্যন্ত রেলভাড়ার পরিমাণ কেবিনের মান অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
গন্তব্য বাড়লে সময় ও খরচ দুটিই বাড়ে। কেউ শুধু লাসা ঘুরে আসেন। আবার অনেকে এভারেস্ট বেজক্যাম্পের পাশাপাশি কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর পর্যন্ত যান।
উচ্চতাজনিত ঝুঁকি
তিব্বত ভ্রমণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চতা। রাজধানী লাসার উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ মিটার। উচ্চতার কারণে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। শরীর খাপ খাইয়ে নিতে সময় না পেলে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রথম দুই দিন বিশ্রামে থাকা, ধীরে চলাফেরা করা এবং বেশি পানি পান করা জরুরি। অনেক এলাকায় উন্নত চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা এবং স্বাস্থ্যবিমা করা নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
পরিবর্তনশীল আবহাওয়া
তিব্বতের আবহাওয়া অনিশ্চিত। দিনে রোদ থাকলেও রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যেতে পারে। একই দিনে তীব্র রোদ, ঠান্ডা বাতাস ও তুষারপাত দেখা যেতে পারে। তাই উষ্ণ পোশাক, উলের মোজা, জ্যাকেট, রোদচশমা ও ত্বক সুরক্ষার সামগ্রী সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।
নগদ অর্থ সঙ্গে রাখুন
লাসার বাইরে স্বয়ংক্রিয় টাকা উত্তোলন কেন্দ্র ও অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থা সীমিত। ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে কেনাকাটার জন্য পর্যাপ্ত চীনা মুদ্রা সঙ্গে রাখা ভালো।
সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
তিব্বতি সমাজ ধর্ম ও সংস্কৃতিনির্ভর। ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের সময় নিয়ম মেনে চলতে হয়। ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া উচিত। স্থানীয় আচার-অনুশাসনের প্রতি সম্মান দেখালে ভ্রমণ স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়।
যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা
তিব্বতে কিছু আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে। অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকে সংরক্ষণ করে রাখা ভালো।
গাইড ছাড়া ভ্রমণ নয়
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিব্বতে অনুমোদিত গাইড ছাড়া ভ্রমণ করা যায় না। নির্ধারিত পথ ও সময়সূচি মেনে চলতে হয়। নিরাপত্তা ও ভাষাগত সহায়তার জন্য গাইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
খাদ্যাভ্যাসে প্রস্তুতি
তিব্বতের খাবারের ধরন ভিন্ন। নতুন স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মানসিক প্রস্তুতি রাখা ভালো। প্রয়োজনে শুকনো খাবার সঙ্গে রাখা যেতে পারে।