মেহেরপুরের সীমান্তঘেঁষা শান্ত গ্রাম আনন্দবাসে ভোরের নরম আলো আর আজানের ধ্বনি যেন একসঙ্গে ইতিহাসের কথা শোনায়। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ১০ গম্বুজ মসজিদ, যা কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং গ্রামটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত আছে, ইসলাম প্রচারক দরবেশদের আগমনের পর এই অঞ্চলে ধর্মীয় চর্চা বিস্তার লাভ করে। তাঁদেরই একজন শেখ ফরিদের অনুপ্রেরণায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। লিখিত দলিল না থাকলেও প্রবীণদের স্মৃতিতেই টিকে আছে নির্মাণের সেই ইতিহাস।

মসজিদ পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইবনে সুয়ায়েজ মামুন জানান, আবুল মাস্টার, মফেম উদ্দীন মণ্ডল ও জিন্দার আলীসহ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন মসজিদটির দেখভাল করেছেন। বর্তমানে তাঁদের উত্তরসূরিরাই দায়িত্ব পালন করছেন এবং স্থানীয় উদ্যোগেই এর রক্ষণাবেক্ষণ চলছে।

বয়োজ্যেষ্ঠ হাসেম আলী বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময়েই মসজিদটি নির্মিত হয় বলে তাঁরা শুনে আসছেন। গ্রামীণ স্থাপত্যে সারিবদ্ধ দশটি গম্বুজের এমন বিন্যাস বিরল, যা মসজিদটিকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

ইমাম মাওলানা সালাহ উদ্দীন জানান, গম্বুজগুলোর একটি আকারে বিশেষ বড়, যা স্থানীয়দের কাছে গর্বের বিষয়। তিনি বলেন, দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে থাকা ষাট গম্বুজ মসজিদ-এর সঙ্গে তুলনা টানলেও আনন্দবাসের মসজিদ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যেই অনন্য। লালচে ইটের গাঁথুনি, প্রশস্ত নামাজঘর এবং খোলা প্রাঙ্গণ গ্রামীণ নির্মাণরীতির সৌন্দর্য তুলে ধরে।

মসজিদের পাশের বাসিন্দা জয়দেব শর্মা জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষরাও এই মসজিদ দেখে গেছেন। তিনি বলেন, মূল ১০ গম্বুজ অংশ অক্ষুণ্ন রেখে পরবর্তী সময়ে সামনে দ্বিতল ভবন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যাতে ঐতিহ্য রক্ষা পায় এবং ব্যবহারিক সুবিধা বাড়ে।

গ্রামে নতুন আরও কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হলেও প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে আসেন। নামাজের পাশাপাশি কুশল বিনিময় ও সামাজিক আলোচনা মিলে এটি গ্রামবাসীর মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, এই মসজিদকে ঘিরেই এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির চর্চা বিস্তার লাভ করেছে। এর আদলে আশপাশে আরও কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।

দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই স্থাপনাটি এখনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্বীকৃতি পেলে এটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।