দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, মনকাড়া আলোকসজ্জা আর সুবিশাল পরিসর মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ধর্মীয় ও পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে বরিশালের বায়তুল আমান জামে মসজিদ। আন্তর্জাতিক মানের নকশা ও নান্দনিক কারুকাজে গড়া এই মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে বেশি পরিচিত গুঠিয়া মসজিদ নামে।

সুদৃশ্য ক্যালিওগ্রাফি, বর্ণিল কাচ এবং মূল্যবান মার্বেল পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত বায়তুল আমান জামে মসজিদ স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। ২০ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদ বরিশাল শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বানারীপাড়া সড়কসংলগ্ন উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত।

মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ১৫শ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরের খোলা অংশে আরও প্রায় ৫ হাজার মানুষ জামাতে অংশ নিতে পারেন। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করেন। বিশেষ করে রাতের আলোকসজ্জা মসজিদটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। এই মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসা।

জানা যায়, ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর গুঠিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু নিজবাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির ওপর মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তার ছোট ভাই মো. আমিনুল ইসলাম নিপু। ২০০৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার নির্মাণ শ্রমিক এই কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বিখ্যাত মসজিদের আদলে নকশা করা হলেও এটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। প্রতিষ্ঠাতা সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু কয়েকজন স্থপতিকে নিয়ে শারজাহ, দুবাই, তুরস্ক, মদিনা, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে যান। বিদেশি স্থাপত্যের অনুপ্রেরণায় তৈরি হয় গুঠিয়া মসজিদের নকশা।

সৌন্দর্যবর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বরিশালের শিল্পী আরিফুর রহমান। ক্যালিওগ্রাফির কাজে সহযোগিতা করেন বশির মেসবাহ।

মসজিদ কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশপথের ডান পাশে রয়েছে বড় একটি পুকুর। পুকুরের পশ্চিম পাশে মসজিদ। মসজিদ সংলগ্ন মিনারের উচ্চতা ১৯৩ ফুট। এছাড়া রয়েছে ২০ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ ময়দান, অফিস ভবন, খতিব ও মুয়াজ্জিনের কোয়ার্টার, এতিমখানা, হাফেজি মাদরাসা, কবরস্থান, ডাকবাংলো, হেলিপ্যাড ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।

সুবিশাল পুকুরটির চারপাশ সাজানো হয়েছে নানা রঙের ফুলগাছ দিয়ে। পাকা রাস্তা, শানবাঁধানো ঘাট এবং প্রবেশপথের দুটি ফোয়ারা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। রাতে আলোর ঝলকানিতে ফোয়ারাগুলো আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। পুকুর এমনভাবে খনন করা হয়েছে যাতে পানিতে মসজিদের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখা যায়।

মধ্যবর্তী কেন্দ্রীয় গম্বুজের চারপাশে বৃত্তাকারে ক্যালিওগ্রাফির মাধ্যমে লেখা হয়েছে আয়াতুল কুরসি। মসজিদের ভেতরের চারপাশে সুরা আর রাহমান ক্যালিওগ্রাফিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চার কোণের গম্বুজ, প্রবেশ তোরণ ও বিভিন্ন অংশে রয়েছে আল কোরআনের আয়াত সম্বলিত নান্দনিক কারুকাজ।

বর্ণিল কাচ, মার্বেল, গ্রানাইট ও সিরামিকের ব্যবহারে ভেতরের সাজসজ্জা সম্পন্ন করা হয়েছে। নয়টি গম্বুজে বসানো হয়েছে নয়টি বড় আকারের ঝাড়বাতি। মেঝেতে রয়েছে ভারত থেকে আনা সাদা মার্বেল টাইলস। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে মুসল্লিদের সুবিধার্থে।

উত্তর পাশে দুইতলা ভবনে রয়েছে কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক কার্যালয়, খতিব ও মুয়াজ্জিনের আবাসন, এতিমখানা ও হাফেজি মাদরাসা। পূর্ব-দক্ষিণ কোণে আড়াই একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়েছে কবরস্থান। তিন দিক ঘিরে লেক এবং কাঁটাতারের বেষ্টনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বিদ্যুৎ লাইনের পাশাপাশি রয়েছে নিজস্ব দুটি উচ্চক্ষমতার জেনারেটর।