বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের সমাগমের সঙ্গে বাড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের চাপ। লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতের আশপাশে জমছে পানির বোতল, প্লাস্টিকের কাপ, খাবারের মোড়ক ও শপিং ব্যাগ। এসব বর্জ্য সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
সাধারণ দিনে সৈকত এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার পর্যটকের সমাগম হয়। ছুটির দিনে এ সংখ্যা বেড়ে এক লাখ থেকে দেড় লাখে পৌঁছায়। হোটেল মালিক সমিতির হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেন।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন প্রায় ৩৪ দশমিক ৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর বড় একটি অংশ হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আশপাশে জমে থাকে। কিছু বর্জ্য নালা ও খাল দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, যা উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
পরিত্যক্ত প্লাস্টিকে ৫০ ফুটের ভাস্কর্য
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরতে সম্প্রতি লাবণী পয়েন্টের কাছে প্রায় পাঁচ টন পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে ৫০ ফুট উঁচু একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ভাস্কর্যটিতে উপড়ে ফেলা নারকেলগাছ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দানবের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ আরমান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ১৫ শিক্ষার্থী টানা ২০ দিন কাজ করে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন। কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকা থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে এটি নির্মাণ করা হয়।
তিনি বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিনিময়ে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে কক্সবাজার থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।”
আরমান জানান, প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে পর্যটকদের সচেতন করতে গত তিন বছর ধরে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
সামুদ্রিক পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
প্লাস্টিক বর্জ্য শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেরও ক্ষতি করে। সূর্যের আলো ও ঢেউয়ের প্রভাবে প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এসব কণা সমুদ্রের পানি ও তলদেশের পলিতে ছড়িয়ে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। এতে সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি হয়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, কাপ ও খাবারের মোড়ক সংগ্রহ এবং অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে উপকূলীয় পরিবেশের পাশাপাশি পর্যটন খাতও হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, “বিশাল এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছি। পাশাপাশি সৈকতে ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করছি, যাতে পর্যটকেরা নির্দিষ্ট স্থানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলতে পারেন। পরে আমাদের সৈকত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সেসব বর্জ্য সংগ্রহ করবেন।”
নওগাঁ থেকে আসা পর্যটক হামিদুর রহমান বলেন, ভাস্কর্যটি যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার পরিণতি তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিহার এবং নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা
শুধু সচেতনতামূলক উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সৈকতসংলগ্ন দোকানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
পর্যটকেরাও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ও ব্যাগ ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে দূষণ কমাতে পারেন।