প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চিলির মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে ছোট্ট একটি আগ্নেয় দ্বীপ। নাম রাপা নুই, যাকে পৃথিবীর বাকি মানুষ চেনে ইস্টার আইল্যান্ড নামে। এই দ্বীপে পৌঁছানো মানেই সময়কে পেছনে ফেলে আসা। এখানকার বাতাসে মিশে আছে হাজার বছরের নীরবতা, রহস্য আর এক বিস্মৃত সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস।

ভোরের আলো ফোটার আগেই গাইড তামারাগি আরেভালো তুকি পর্যটককে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বৃষ্টি আর অন্ধকার উপেক্ষা করে কয়েক পা হাঁটতেই চোখে পড়ে সেই দৃশ্য। সমুদ্রের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পনেরোটি বিশাল পাথরের মূর্তি। সবচেয়ে উঁচুটির উচ্চতা নয় মিটার। স্থানীয়রা এদের বলে মোয়াই।

রাপা নুইয়ে পলিনেশিয়ান নাবিকদের আগমন ঘটেছিল আনুমানিক ৪০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। তবে ইউরোপীয়দের কাছে এই দ্বীপ পরিচিত হয় ১৭২২ সালের ৫ এপ্রিল, যখন ডাচ নাবিক জ্যাকব রগেভিন ইস্টার রোববারের দিন এই ভূখণ্ড আবিষ্কার করেন এবং নাম রাখেন পাশ-আইল্যান্ড। পরে দ্বীপটি ১৮৮৮ সালে চিলির অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু সাত হাজার স্থানীয় বাসিন্দার কাছে এটি চিরকালই রাপা নুই।

দ্বীপের পূর্ব প্রান্তের রানো রারাকু পাথরখনিতে একসময় প্রায় এক হাজার মোয়াই তৈরি হয়েছিল। কোনো কোনোটির ওজন ছিল ৮৫ টনেরও বেশি। প্রতিটি মূর্তি নির্মিত হয়েছিল কোনো প্রয়াত গোত্রপ্রধানের স্মরণে, এই বিশ্বাসে যে তাঁদের মানা বা জীবনশক্তি বংশধরদের রক্ষা করবে। তবে কোনো এক অজানা কারণে কয়েক শ মোয়াই খনিতেই মাটির নিচে আধডোবা অবস্থায় থেকে যায়। বাকিগুলো দড়ির সাহায্যে টেনে উপকূলের বিভিন্ন গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে স্থানীয়রাই এই মূর্তিগুলো উপড়ে ফেলে, কারণ তারা বিশ্বাস হারিয়েছিল মূর্তির শক্তিতে। বর্তমানে যে চল্লিশটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পুনরায় স্থাপন করা হয়েছে।

দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে রানো কাউ আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দেখে মন আনন্দে ভরে ওঠে। এক কিলোমিটার চওড়া এই নিষ্ক্রিয় জ্বালামুখের বাইরের দেয়াল সরাসরি গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে। একসময় এখানে এক বিপজ্জনক বার্ষিক প্রতিযোগিতা হতো, যেখানে দ্বীপের সবচেয়ে সাহসী পুরুষেরা খাড়া পাথর বেয়ে নামতেন এবং হাঙরভর্তি জলে সাঁতার কাটতেন।

উত্তর উপকূলের পাথুরে পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেও কোনো পর্যটকের দেখা মেলে না। ফার্নে ঢাকা গুহায় প্রাচীন খোদাই, মাটিতে পড়ে থাকা মূর্তি, আর দিগন্তজোড়া সমুদ্রের দৃশ্য মিলিয়ে রাপা নুই যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের পাতা।