বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ স্থাপনা আজও বহন করছে বাংলার নবাবি আমলের বেদনাবিধুর ইতিহাস। একসময় বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা জিনজিরা প্রাসাদের বড় অংশ হারিয়ে গেলেও টিকে থাকা কয়েকটি অংশ মনে করিয়ে দেয় পলাশীর যুদ্ধের পরের অস্থির সময়ের কথা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের সদস্যদের বন্দি করে রাখার স্থান হিসেবেও ইতিহাসে এই প্রাসাদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
মোগল আমলে নির্মাণ
জিনজিরা প্রাসাদের নির্মাণকাল নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সরকারি একটি তথ্যভান্ডারে ১৬২০-২১ সালের দিকে সুবেদার ইবরাহিম খাঁর নির্মিত ‘নওঘরা’র সঙ্গে প্রাসাদটির সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু বিবরণে ১৬৮৯ থেকে ১৬৯৭ সালের মধ্যে নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। ‘জিনজিরা’ নামটি আরবি ‘জাজিরা’ থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়, যার অর্থ দ্বীপ বা দ্বীপসদৃশ এলাকা।
একসময় প্রাসাদটি কয়েক একর জায়গাজুড়ে ছিল। চারপাশে ছিল খোলা জায়গা, গাছপালা ও নদীর পরিবেশ। নগরায়ণের চাপে সেই চিত্র এখন আর নেই। বর্তমানে প্রাসাদের মাত্র কয়েকটি ভগ্নাংশ টিকে আছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও স্থাপনাটির জরাজীর্ণ অবস্থা ও অস্তিত্ব সংকটের কথা উঠে এসেছে।
সিরাজের পরিবারের বন্দিজীবন
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের নারী সদস্যদের জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে সরকারি পর্যটন তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিরাজের মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, কন্যা উম্মে জোহরা এবং ঘসেটি বেগমসহ অন্যরা।
এই ঘটনার কারণে জিনজিরা প্রাসাদ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। পলাশীর যুদ্ধ, নবাবি পরিবারের পতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে এর ইতিহাস গভীরভাবে যুক্ত।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে জিনজিরা প্রাসাদে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। সদরঘাট বা সোয়ারীঘাট থেকে নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিনজিরা এলাকায় যাওয়া যায়। সরকারি ঢাকা জেলা তথ্যভান্ডারেও সদরঘাট থেকে নৌপথে জিনজিরা যাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে এটি সাজানো পর্যটনকেন্দ্র নয়। স্থানীয় বসতির ভেতর দিয়ে সরু পথ ধরে যেতে হয়। তাই প্রথমবার গেলে স্থানীয়দের কাছ থেকে পথ জেনে নেওয়া সুবিধাজনক।
সংরক্ষণ জরুরি
জিনজিরা প্রাসাদ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও দীর্ঘদিনের অযত্ন, দখল ও নগরায়ণের কারণে এর বড় অংশ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে টিকে থাকা অংশগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে।
যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা করা গেলে ঢাকার কাছেই এই স্থাপনাটি ইতিহাসভিত্তিক ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।