প্রায় ছয় শতাব্দীর ইতিহাস, অনন্য স্থাপত্য আর সবুজে ঘেরা পরিবেশ। এসব আকর্ষণে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ। মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি ১৯৮৫ সালে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাটের অংশ হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ মসজিদ ছাড়াও রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপনা। মসজিদের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৫ শতকের শুরুতে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এ অঞ্চলে এসে খলিফাতাবাদ জনপদ গড়ে তোলেন। ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর সময় লেগেছিল। চুন, সুরকি, কালোপাথর ও ছোট ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদটির স্থাপত্যে মধ্য এশিয়ার তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
মসজিদের নাম ষাটগম্বুজ হলেও প্রকৃত গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। সাত সারিতে ১১টি করে ৭৭টি গম্বুজের পাশাপাশি চার কোণে রয়েছে আরও চারটি গম্বুজ। মসজিদের দেয়াল প্রায় সাড়ে ৮ ফুট পুরু।
‘ষাটগম্বুজ’ নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে মতভেদ। মসজিদের ভেতরে ছয় সারিতে ১০টি করে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ থাকায় এ নাম হয়েছে বলে একটি মত রয়েছে। তবে মসজিদে কোনো শিলালিপি না থাকায় নির্মাণের সঠিক সময় ও নির্মাতা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ও টিকিট
ফজর থেকে এশা পর্যন্ত নামাজের সময় মসজিদে প্রবেশে কোনো ফি নেই। তবে পুরাকীর্তি হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদ কমপ্লেক্স পরিদর্শনে টিকিট লাগে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন।
দেশি দর্শনার্থীর টিকিট ৩০ টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ১০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা। একই টিকিটে মসজিদ কমপ্লেক্সের জাদুঘরও দেখা যায়।
বাড়ছে পর্যটন সম্ভাবনা
ষাটগম্বুজ মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। দুই ঈদের প্রধান জামাতেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি সমবেত হন।
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী এনামুল আহসান বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে এসে মসজিদের পরিবেশ ও স্থাপত্য দেখে তার ভালো লেগেছে। ঝালকাঠির দর্শনার্থী হিমায়লও আগের তুলনায় পরিবেশ আরও ভালো হয়েছে বলে জানান।
ট্যুরিস্ট পুলিশ বাগেরহাট জোনের পুলিশ পরিদর্শক তারেক ফয়সাল ইবনে আজিজ জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় সকাল ৯টা থেকে দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করা হয়।
বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মো. জায়েদ জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।