নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। পাহাড়, স্বচ্ছ জলধারা, সিলিকা বালু, লোককাহিনি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো পেলে আরও বড় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

আঁকাবাঁকা পথ, সারিবদ্ধ পাহাড়-টিলা আর মহাদেওসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও ছড়ায় ঘেরা নেত্রকোনার কলমাকান্দা প্রকৃতির এক বৈচিত্র্যময় জনপদ। ৩৭৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নের কিছু এলাকা ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী।

রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন পাহাড়ের কোলঘেঁষা দুটি দর্শনীয় এলাকা। পাহাড়ের স্তরে স্তরে পাথর, স্বচ্ছ জলধারা, সিলিকা বালু এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। স্থানীয়দের মতে, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে।

চন্দ্রডিঙা নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে একটি লোককাহিনি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মনসামঙ্গল কাব্যের চরিত্র চাঁদ সওদাগরের ডিঙি এখানে আটকে যাওয়ার ঘটনা থেকেই নামটির উৎপত্তি। তবে এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাহাড়ের একটি পাথরের আকৃতি নৌকার মাস্তুলের মতো হওয়ায় সেখানে হাজং ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় আচারও পালন করেন।

তবে সীমান্তবর্তী হওয়ায় পর্যটকদের ভ্রমণে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তার কারণে কিছু এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে এবং চন্দ্রডিঙার কাছে হাতিবেড় এলাকায় বিজিবির চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

বিজিবি নেত্রকোনা-৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে সীমান্তের কিছু স্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। ঝুঁকি এড়াতে চেকপোস্ট বসিয়ে পর্যটকদের সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পর্যটকেরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।’

চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের পথে পাতলাবন সীমান্ত এলাকা। সেখানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে মহাদেও নদ। স্বচ্ছ পানি ও সিলিকা বালুর বিস্তীর্ণ চর এ এলাকার অন্যতম আকর্ষণ। তবে বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেড়ে যেতে পারে, তাই ভ্রমণে সতর্কতা জরুরি।

পাতলাবনের বাসিন্দা ঝুমুর মারাক জানান, চন্দ্রডিঙা, পাতলাবন, বেতগড়া, চেংগ্নী ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। চেংগ্নী পাহাড়ের গোপালপুর মন্দিরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, পর্যটকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা ও থাকা-খাওয়ার সুবিধা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত আবাসন ও পর্যটনসেবা গড়ে উঠলে এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন আরও বাড়তে পারে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি কলমাকান্দায় যাওয়া যায়। এছাড়া কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে নেত্রকোনা এসে সেখান থেকে বাস, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে কলমাকান্দা যাওয়া যায়। উপজেলা সদর থেকে চন্দ্রডিঙা এলাকায় যেতে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

ভ্রমণ পরামর্শ

সীমান্ত এলাকায় ভ্রমণের সময় বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলা এবং অনুমোদিত এলাকার বাইরে না যাওয়াই নিরাপদ।