বাংলাদেশে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়, হাওর ও সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য থাকলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, জটিল ভিসা ব্যবস্থা, দুর্বল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রচারের ঘাটতি এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে সম্ভাবনাময় এই খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নওগাঁর পাহাড়পুরে এক চীনা পর্যটক অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও হয়রানির শিকার হন। পরে ট্যুরিস্ট পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করে। এর আগে নাটোরে দুই বিদেশি নাগরিককে কটূক্তির ঘটনাতেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

দেশে এত স্পট থাকার পরও বিদেশি পর্যটকের খরা কেন

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা ভ্রমণ সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে।

এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের জন্য হোটেল ও খাবারের তুলনামূলক উচ্চ ব্যয়, সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত বিনোদনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনসেবার ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে দেশের পর্যটন খাত এখনও মূলত দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আযম কোরেশীর মতে, বিদেশি পর্যটক আকৃষ্টে দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিকল্পনা ও আলোচনা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন খুব কম হয়েছে। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো হলেও কার্যকর প্রচারের অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশে এখনও পুরোনো নেতিবাচক ধারণার প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি এখনও পূর্ণাঙ্গ ই-ভিসা চালু না হওয়া, ভিসা পেতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে।

এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের জন্য বিদেশিদের আলাদা সরকারি অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতাও অনেকের কাছে ভ্রমণ পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে।

সুন্দরবন

অন্যদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার ফুয়াদ সাকিব বলেন, বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সবসময় সক্রিয় রয়েছে। কোনো বিদেশি পর্যটক হয়রানির শিকার হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজারে। ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৬ লাখ বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি এখনও খুবই সীমিত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবকাঠামোর উন্নয়ন, সহজ ও আধুনিক ভিসা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রচার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, পর্যটনসেবার মানোন্নয়ন এবং পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

• বিদেশি পর্যটক (২০২৪): ৬ লাখ ৬০ হাজার
• বিদেশি পর্যটক (১৯৯৫): ১ লাখ ৫৬ হাজার
• ১৯৯৫-২০২৪ সময়ে মোট বিদেশি পর্যটক: প্রায় ৮৬ লাখ
• প্রধান চ্যালেঞ্জ: নিরাপত্তা, ভিসা জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রচারের অভাব, উচ্চ ব্যয়ে নিম্নমানের সেবা