দেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওর প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পাখিপ্রেমীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বছরজুড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটনসেবা গড়ে না ওঠায় এখানকার ইকো ট্যুরিজমের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়নের আগেই থেমে যাচ্ছে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্ট হাকালুকি হাওরে প্রবেশের প্রধান পথ। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাজার পর্যন্ত সড়ক থাকলেও সেখানেই শেষ হয়েছে মূল যোগাযোগব্যবস্থা। এখান থেকেই পর্যটকদের হাওরে যাত্রা শুরু করতে হয়।
বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটি ও উৎসবের সময় পর্যটকের চাপ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু ছোট বাজারে পর্যাপ্ত পার্কিং, বিশ্রামাগার, খাবারের ব্যবস্থা কিংবা পর্যটকবান্ধব অন্যান্য সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আগে থাকা একটি সরকারি খাদ্যগুদাম ভেঙে ফেলা হলেও সেখানে এখনো নতুন কোনো পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, আগের তুলনায় সড়কের কিছু উন্নয়ন হয়েছে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের পথ অতিক্রম করতেও প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য মানসম্মত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, হাকালুকিতে ইকো ট্যুরিজম উন্নয়নের আশ্বাস বহুবার দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এলাকাও পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা কাগজে-কলমেই আটকে রয়েছে।
তবে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও প্রতিদিন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ছুটে আসছেন হাকালুকির সবুজ জলাভূমি, বিস্তীর্ণ জলরাশি ও শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে। স্থানীয়দের মতে, পর্যটনকেন্দ্রিক নৌযান, খাবার, স্থানীয় পণ্য বিক্রি এবং অন্যান্য সেবার মাধ্যমে ইতোমধ্যে শত শত মানুষের জীবিকা এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পরিকল্পিত ইকো ট্যুরিজম বাস্তবায়ন হলে নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইকো ট্যুরিজমের মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করে পর্যটন পরিচালনা করা। তাই হাকালুকিতে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নৌপরিবহন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার নিয়ে হাকালুকি ঘুরতে আসা পর্যটক আব্দুল বাতেন বলেন, "হাওরের পরিবেশ অসাধারণ। তবে পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার। যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা উন্নত করা গেলে এটি বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।"
এ বিষয়ে সাবেক পর্যটন সচিব এম মুহিবুল হক বলেন, হাওর অঞ্চলকে ঘিরে পর্যটনশিল্প বিকাশে সরকারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনায় ইকো ট্যুরিজমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
অবস্থান: ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্ট দিয়ে হাকালুকি হাওরে প্রবেশ।
প্রধান সমস্যা: অবকাঠামোর অভাব, ধীর যোগাযোগব্যবস্থা, পার্কিং সংকট ও পর্যটনসেবার সীমাবদ্ধতা।
সম্ভাবনা: পরিবেশবান্ধব পর্যটন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং হাওরভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন।