সুন্দরবনের নদী ও খালঘেঁষা এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও কটেজগুলো নিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ। গবেষকদের মতে, স্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন বিস্তার পাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পর্যটক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনজ পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।

সরকার বলছে, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশকারী বনজীবী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কেউ বনে প্রবেশ করলেই খুদে বার্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে এবং নিরাপত্তা নজরদারি জোরদার করা সম্ভব হবে।

পূর্ব সুন্দরবনের প্রবেশমুখ ঢাংমারী খাল এলাকায় ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে একাধিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র। ইরাবতি ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই খালে রয়েছে নোনা পানির কুমিরও। পশুর নদী থেকে বিচ্ছিন্ন খালটির পাড়জুড়ে তৈরি হয়েছে প্রায় ১৫টি কাঠ ও গোলপাতার কটেজ।

স্থানীয়দের অনেকে জীবিকার পরিবর্তন এনে এখন পর্যটন খাতে যুক্ত হচ্ছেন। জলিল হাওলাদার একসময় বনজীবী হিসেবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতেন। বর্তমানে তিনি একটি রিসোর্টে কাজ করছেন। একইভাবে দুলাল ফরাজিও দীর্ঘ ২৫ বছর বননির্ভর জীবন কাটানোর পর ঝুঁকির কারণে পেশা বদলেছেন।

গবেষকদের মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে পর্যটক অপহরণ, দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, ইকো ট্যুরিজমের নামে নদী ও খালঘেঁষে বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট গড়ে উঠছে। পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যদিও এতে স্থানীয় কিছু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

সরকার এখন সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনার কথা ভাবছে। স্থানীয় মানুষের বাড়িঘরকে পর্যটকদের আবাসিক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করে বিকেন্দ্রীভূত পর্যটন গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বনজীবীদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটন খাত থেকে ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। তবে গত কয়েক বছরে সেই আয় কমে প্রায় ৩ কোটিতে নেমে এসেছে।

এ অবস্থায় গবেষকদের পরামর্শ, সুন্দরবন রক্ষায় স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি অন্তত ২০ বছর মেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। এতে পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ পর্যটন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।