ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ঘিরে প্রতিদিন ভিড় করেন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক। কিন্তু দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাতেই এখনো চালু হয়নি অফিসিয়াল গাইড সেবা। ফলে সোমপুর মহাবিহারের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পেয়েই ফিরতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন সোমপুর মহাবিহার ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন এখানে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ দর্শনার্থী আসেন। ছুটির দিনে সেই সংখ্যা বেড়ে ৮০০ থেকে এক হাজারে পৌঁছে যায়।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে অফিসিয়াল গাইড না থাকায় দর্শনার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দাপ্তরিক তথ্যমতে, বর্তমানে এখানে ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মাস্টাররোলে আরও ২৭ জন কর্মরত আছেন। মোট জনবল প্রায় ৪৫ জন হলেও পর্যটক সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গাইড ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি।
শুধু গাইড সংকট নয়, পর্যটকদের জন্য আবাসন, বিশ্রামাগার, লকার রুম ও মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থাও সীমিত। এতে সামগ্রিক পর্যটন অভিজ্ঞতায় প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক মাসুদ হোসেন বলেন, “এখানে পরিবেশ খুব ভালো। কিন্তু গাইড না থাকায় ইতিহাসটা ঠিকভাবে জানা যায় না। গাইড থাকলে ভ্রমণ আরও সমৃদ্ধ হতো।”
সন্তানকে নিয়ে পাহাড়পুর দেখতে আসা শাপলা আক্তার বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এখানে আসি। কিন্তু পাহাড়পুর সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। এখন সন্তানকে নিয়ে আসি। নতুন প্রজন্মের জন্য হলেও এখানে গাইড সেবা চালু হওয়া প্রয়োজন।”
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টোডিয়ান মুহাম্মদ ফজলুল করিম বলেন, “এখানে অফিসিয়াল গাইড নেই। তবে কয়েকজন কর্মী অনানুষ্ঠানিকভাবে দর্শনার্থীদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। বিদেশি পর্যটকদেরও প্রয়োজনে সহযোগিতা করা হয়।”
তিনি জানান, বিদেশি পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আগামী অর্থবছরে অনুবাদ-সুবিধাসম্পন্ন একটি নতুন ডিভাইস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে গাইডদের বাংলা ভাষার বক্তব্য বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে উপস্থাপন করা যাবে।
এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম পাশের গেট চালু হলে সেখানে ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে পাহাড়পুরের ইতিহাস ও তথ্য তুলে ধরার ব্যবস্থাও রাখা হবে বলে জানান তিনি।
আবাসন সংকট প্রসঙ্গে কাস্টোডিয়ান বলেন, বর্তমানে পাহাড়পুরে চারটি রেস্ট হাউজ ভবনে মোট ১৫টি কক্ষ রয়েছে। তবে দর্শনার্থীর তুলনায় এই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। নতুন সড়কের কাজ শেষ হলে আশপাশে বড় পরিসরে আবাসন সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, “একটি ঐতিহাসিক স্থানের মূল আকর্ষণ শুধু স্থাপনা নয়, এর ইতিহাস ও ঐতিহ্যও। গাইড না থাকায় দর্শনার্থীরা সেই তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রশিক্ষিত গাইড খুবই প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান, দ্রুত প্রশিক্ষিত গাইড নিয়োগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হবে।