চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর কংক্রিটের ভিড়ের মাঝেই গড়ে উঠেছে এক টুকরো ঘন সবুজ অরণ্য। জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির উদ্ভাবিত বিশেষ বনায়ন পদ্ধতিতে তৈরি এই ‘মিয়াওয়াকি বন’ এখন পরিবেশপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও নগরবাসীর কাছে অন্যতম আকর্ষণ। স্বল্প জায়গায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘন বন তৈরি করার এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও কার্যকর উদাহরণ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকা এবং মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড়ে গড়ে ওঠা মিয়াওয়াকি বন এখন শুধু সবুজায়নের প্রকল্প নয়, বরং নগর জীবনে স্বস্তির নতুন প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
জাপানের উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিতে গাছগুলো সাধারণ বনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ৩০ গুণ বেশি ঘন হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এসব বন তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন।
বাংলাদেশে এই পদ্ধতির প্রথম সফল প্রয়োগ হয় চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সোনাপাহাড় এলাকায়। উদ্যোক্তা আমজাদ হোসেন ও প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের দেলোয়ার জাহানের উদ্যোগে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে বনটি গড়ে তোলা হয়। পরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন টাইগারপাস ও ওয়াসা মোড়ের মধ্যবর্তী পাহাড়ি ঢালেও মিয়াওয়াকি বন তৈরি করে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগেও এই পদ্ধতিতে বনায়ন করা হয়েছে।
কী দেখবেন
ঘন সবুজের অনন্য পরিবেশ
মিয়াওয়াকি বনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর ঘনত্ব। গাছগুলো খুব কাছাকাছি লাগানো হয় বলে অল্প জায়গার মধ্যেই তৈরি হয় নিবিড় অরণ্যের আবহ। শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়েও মনে হবে যেন গহীন বনের ভেতর হাঁটছেন।
দেশীয় গাছের বৈচিত্র্য
এই বনগুলোতে মূলত দেশীয় ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। মিরসরাইয়ের বনে রয়েছে প্রায় ১২০ প্রজাতির গাছ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনে রয়েছে প্রায় ৫০ প্রজাতি। বহেড়া, আমলকী, অর্জুন, নিম, জারুল, কৃষ্ণচূড়াসহ নানা বনজ ও ঔষধি গাছ এখানে দেখা যায়।
পাখি ও জীববৈচিত্র্যের উপস্থিতি
ঘন এই বন এখন ছোট পাখি, প্রজাপতি ও বিভিন্ন পতঙ্গের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাখির ডাক আর প্রাকৃতিক শব্দ দর্শনার্থীদের আলাদা প্রশান্তি দেয়।
পাহাড়ি ট্রেইলে হাঁটার অভিজ্ঞতা
চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢালকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে এই বন। ভেতরের হাঁটার পথগুলো উঁচুনিচু পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে সাজানো। ফলে ট্রেইলে হাঁটার অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে ভিন্নধর্মী।
আধুনিক বনায়ন প্রযুক্তি দেখার সুযোগ
পরিবেশ ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় স্থান। কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে ছোট চারাগাছ ঘন বনে পরিণত হয়, তা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
রিফ্রেশিং ওয়াকিং ট্রেইল
সকাল কিংবা বিকেলে বনের ভেতরে হাঁটাহাঁটি করলে শীতল পরিবেশ ও নির্মল বাতাস সহজেই মনকে সতেজ করে তোলে। অনেকেই এখানে সময় কাটাতে বা হালকা ব্যায়ামের জন্যও আসেন।
কীভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম শহরের টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত মিয়াওয়াকি বনে পৌঁছানো বেশ সহজ। শহরের যেকোনো স্থান থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবায় টাইগারপাস পুলিশ বক্স পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে অল্প হাঁটলেই দেখা মিলবে বনের প্রবেশপথের।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে টাইগারপাসের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। স্টেশন এলাকা থেকে রিকশা বা সিএনজিতে মাত্র ১০ মিনিটেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব।
অন্যদিকে মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকার মিয়াওয়াকি বন দেখতে চাইলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সরাসরি জোড়ারগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাপাহাড় এলাকায় যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, স্টেশন রোড ও জিইসি মোড় এলাকায় বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল প্যারামাউন্ট, হোটেল স্টার পার্ক, হোটেল হিল টন সিটি, হোটেল ডায়মন্ড পার্ক, হোটেল সাফিনা, এশিয়ান এসআর হোটেল ও হোটেল মিসকাসহ আরও অনেক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়।
কোথায় খাবেন
টাইগারপাস, লালখান বাজার ও জিইসি মোড় এলাকায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের খাবারের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস খেতে চাইলে মেজবান হাইলে আইয়ুন বা জামান হোটেলে যেতে পারেন। এছাড়া আশপাশে ছোট ক্যাফে, টি-স্টল ও হালকা নাস্তার দোকানও রয়েছে।
ভ্রমণ পরামর্শ
মিয়াওয়াকি বনে প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না। বিকেলের দিকে গেলে আলো-ছায়ার সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করা যায়। তবে ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক বা যেকোনো ধরনের ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।